৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

যেসব কারণে গোসল ফরজ হয়
পবিত্রতা ইসলামের মৌলিক ভিত্তিগুলোর একটি। নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত ও ইবাদতের জন্য বাহ্যিক ও অন্তরের পবিত্রতা অপরিহার্য। অনেক সময় মানুষ জানে না— কোন অবস্থায় শুধু ওজু যথেষ্ট, আর কোন অবস্থায় গোসল ফরজ হয়ে যায়। অজ্ঞতার কারণে ইবাদত শুদ্ধ না হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই কুরআন–হাদিসের আলোকে গোসল ফরজ হওয়ার কারণগুলো জানা প্রত্যেক মুসলিম নর–নারীর জন্য অত্যন্ত জরুরি।

গোসল ফরজ হওয়ার মূলনীতি (কুরআনের নির্দেশ)

আল্লাহ তায়ালা বলেন—

وَإِنْ كُنْتُمْ جُنُبًا فَاطَّهَّرُوا

‘আর যদি তোমরা অপবিত্র (জুনুব) হও, তবে ভালোভাবে পবিত্রতা অর্জন করো।’ (সুরা আল-মায়িদা: আয়াত ৬)

এ আয়াত থেকেই বোঝা যায়— কিছু নির্দিষ্ট অপবিত্রতার অবস্থায় পূর্ণ গোসল করা ফরজ। দলিলসহ গোসল ফরজ হওয়ার কারণগুলো হলো—

১️. বীর্যপাত হওয়া (স্বপ্নে বা জাগ্রত অবস্থায়)

যদি পুরুষ বা নারীর কাছ থেকে বীর্য উত্তেজনার সঙ্গে বের হয়— স্বপ্নে হোক বা জাগ্রত অবস্থায়— তাহলে গোসল ফরজ। হাদিসে এসেছে—

إِنَّمَا الْمَاءُ مِنَ الْمَاءِ

‘পানি (গোসল) ফরজ হয় পানি (বীর্য) নির্গত হওয়ার কারণে।’ (মুসলিম ৩৪৩)

আর হজরত আয়েশা (রা.) বলেন—

إِذَا رَأَى الْمَاءَ فَلْيَغْتَسِلْ

‘যদি কেউ বীর্য দেখতে পায়, তবে সে গোসল করবে।’ (বুখারি ২৮০)

২️. স্বামী–স্ত্রীর সহবাস (বীর্যপাত না হলেও)

সহবাসের সময় লজ্জাস্থান পরস্পরের মধ্যে প্রবেশ করলেই গোসল ফরজ হয়ে যায়, বীর্যপাত হোক বা না হোক। হাদিসে এসেছে—

إِذَا جَلَسَ بَيْنَ شُعَبِهَا الْأَرْبَعِ ثُمَّ جَهَدَهَا فَقَدْ وَجَبَ الْغُسْلُ

‘যখন কেউ তার স্ত্রীর চার অঙ্গের মাঝে অবস্থান করে সহবাস করে, তখন গোসল ফরজ হয়ে যায়।’ (বুখারি ২৯১, মুসলিম ৩৪৮)

৩️. হায়েজ (মাসিক) শেষ হওয়া

নারীদের মাসিক শেষ হলে গোসল করা ফরজ। গোসল ছাড়া নামাজ, রোজা ও অন্যান্য ইবাদত করা যাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন—

فَإِذَا تَطَهَّرْنَ فَأْتُوهُنَّ

‘অতঃপর যখন তারা পবিত্র হয় (গোসল করে), তখন তাদের কাছে যাবে।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২২২)

হজরত ফাতিমা বিনতে আবি হুবাইশ (রা.)–কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—

فَإِذَا أَقْبَلَتِ الْحَيْضَةُ فَدَعِي الصَّلَاةَ، فَإِذَا ذَهَبَ قَدْرُهَا فَاغْتَسِلِي

‘যখন হায়েজ আসে নামাজ ছেড়ে দেবে, আর যখন তা শেষ হবে, তখন গোসল করবে।’ (বুখারি ৩২০)

৪️. নিফাস (প্রসব পরবর্তী রক্তপাত) শেষ হওয়া

সন্তান প্রসবের পর রক্তপাত বন্ধ হলে নারীর ওপর গোসল ফরজ হয়। হাদিসে এসেছে—

হজরত উম্মে সালামা (রা.) বলেন—

كَانَتِ النُّفَسَاءُ تَقْعُدُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ أَرْبَعِينَ يَوْمًا

‘রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর যুগে প্রসূতি নারীরা চল্লিশ দিন পর্যন্ত (নিফাস অবস্থায়) থাকতেন।’ (আবু দাউদ ৩১১)

সন্তান প্রসবের পর প্রসূতির রক্ত বন্ধ হলে গোসল করেই ইবাদতে ফিরতে হবে—এটাই ফিকহের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত।

৫️. ইসলাম গ্রহণ করা (অমুসলিম থেকে মুসলিম হলে)

কোনো ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করলে অধিকাংশ আলেমের মতে তার জন্য গোসল করা ফরজ। হাদিসে এসেছে,

أَنَّ ثُمَامَةَ بْنَ أُثَالٍ أَسْلَمَ فَأَمَرَهُ النَّبِيُّ ﷺ أَنْ يَغْتَسِلَ

‘সুমামা ইবনে উসাল ইসলাম গ্রহণ করলে নবী (সা.) তাকে গোসল করার নির্দেশ দেন।’ (নাসাঈ ১৮৮)

গোসল ফরজ হওয়া কোনো কঠিন বিধান নয়; বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য পবিত্রতার অনুগ্রহ। শরীর ও আত্মাকে পরিচ্ছন্ন করে ইবাদতের উপযোগী করে তোলাই এর উদ্দেশ্য। তাই কী কী কারণে গোসল ফরজ হয়, সেগুলো সংক্ষেপে মনে রাখুন—

> বীর্যপাত

> সহবাস

> হায়েজ শেষ

> নিফাস শেষ

> ইসলাম গ্রহণ

এই অবস্থাগুলোতে গোসল ছাড়া ইবাদত গ্রহণযোগ্য নয়।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের দ্বীনের সঠিক জ্ঞান অর্জন করে শুদ্ধভাবে আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।