দুই বছরের বেশি সময় পর যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় আবারও সংগঠিত ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়েছে। ধ্বংসস্তূপে পরিণত গাজা শহরের তাল আল-হাওয়া এলাকায় একটি অর্ধেক আকারের মাঠে এই টুর্নামেন্টের খেলা হয় বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) গাজা শহরের ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভবন ও ধ্বংসাবশেষের মাঝখানে আয়োজিত পাঁচজনের (ফাইভ-এ-সাইড) ফুটবল ম্যাচে মুখোমুখি হয় জাবালিয়া ইয়ুথ ও আল-সাদাকা। ম্যাচটি ড্র হয়। একইভাবে বেইত হানুন ও আল-শুজাইয়ার মধ্যকার আরেকটি ম্যাচও ড্রয়ে শেষ হয়।
তবে ফলাফল নয়, দীর্ঘদিন পর মাঠে ফুটবল ফেরায় উচ্ছ্বাসই ছিল দর্শকদের মুখ্য অনুভূতি। গাজা শহরের ধ্বংসপ্রাপ্ত তাল আল-হাওয়া এলাকার ‘প্যালেস্টাইন পিচ’-এর পাশে দাঁড়িয়ে দর্শকেরা করতালি ও উল্লাসে খেলোয়াড়দের উৎসাহ দেন। অনেক শিশু ভাঙা কংক্রিটের দেয়াল বেয়ে উঠে কিংবা ধ্বংসস্তূপের ফাঁক দিয়ে খেলা দেখার চেষ্টা করে। কেউ কেউ ড্রাম বাজিয়েও উৎসাহ জোগান।
জাবালিয়া ইয়ুথের ২১ বছর বয়সী খেলোয়াড় ইউসুফ জেনদিয়া মাঠে ফিরতে পারার অনুভূতি বর্ণনা করে বলেন, ‘মিশ্র অনুভূতি—খুশি, দুঃখ, আনন্দ সব একসঙ্গে।’
তিনি জানান, যুদ্ধের কারণে তার এলাকার বড় অংশ জনশূন্য হয়ে পড়েছে এবং অনেক জায়গা ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানে গুঁড়িয়ে গেছে। ইউসুফ বলেন, ‘সকালে মানুষ পানি, খাবার আর রুটির খোঁজে বের হয়। জীবন খুব কঠিন। তবে দিনের সামান্য কিছু সময় থাকে, যখন ফুটবল খেলতে এসে ভেতরের একটু আনন্দ প্রকাশ করা যায়।’
একই সঙ্গে মাঠে আসার সময় অনেক সতীর্থের অনুপস্থিতির কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘অনেক সতীর্থ নিহত হয়েছে, কেউ আহত, কেউ চিকিৎসার জন্য বাইরে গেছে। তাই আনন্দটা পূর্ণ নয়।’
রয়টার্স জানায়, যুদ্ধবিরতির চার মাস পেরিয়ে গেলেও গাজায় বড় ধরনের পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হয়নি। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে হামলা এবং প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত ও ২৫১ জনকে অপহরণের ঘটনার পর শুরু হওয়া দুই বছরের যুদ্ধের পর এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। চলমান উত্তেজনা ও সংঘাতের কারণে গাজার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা থেকে বাসিন্দারা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। দুই মিলিয়নের বেশি মানুষকে উপকূলবর্তী ধ্বংসপ্রায় ছোট একটি অংশে আশ্রয় নিতে হয়েছে, যেখানে অধিকাংশই অস্থায়ী তাঁবু বা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে বসবাস করছেন।
গাজা শহরের ৯ হাজার দর্শক ধারণক্ষম ইয়র্মুক স্টেডিয়াম, যা যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি বাহিনী ধ্বংস করে এবং পরে আটক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে, সেটির স্থানেই এখন সারি সারি সাদা তাঁবুতে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো বসবাস করছে।
এই সপ্তাহের টুর্নামেন্ট আয়োজনের জন্য ফিলিস্তিনি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন একটি অর্ধেক আকারের মাঠ থেকে ভাঙা দেয়ালের ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে নেয়, চারপাশে অস্থায়ী বেড়া দেয় এবং পুরোনো কৃত্রিম ঘাসের ওপর জমে থাকা ময়লা পরিষ্কার করে খেলার উপযোগী করে তোলে।
বেইত হানুন দলের খেলোয়াড় আমজাদ আবু আওদা বলেন, মাঠে নামার মধ্য দিয়ে তারা একটি বার্তা দিতে চেয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘ধ্বংস আর গণহত্যামূলক যুদ্ধের মধ্যেও আমরা খেলছি, আমরা বেঁচে আছি। জীবন থেমে থাকে না—জীবন চলতেই হবে।’
তবে গাজায় গণহত্যা চালানোর অভিযোগ ইসরায়েল দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছে। দেশটির দাবি, বেসামরিক মানুষদের সুরক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং হামাস বেসামরিক জনগোষ্ঠীর মাঝেই অবস্থান নিয়ে লড়াই চালিয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই টুর্নামেন্ট গাজার মানুষের কাছে কেবল একটি খেলাধুলার আয়োজন নয়, বরং যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার এক ক্ষুদ্র প্রতীক।