১৪ জানুয়ারি, ২০২৬

ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে নিহতের সংখ্যা ছাড়াল ১২ হাজার

ইরানে টানা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কর্তৃপক্ষের কঠোর অভিযানে নিহতের সংখ্যা আগের ধারণার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এই সহিংসতায় এখন পর্যন্ত ১২ হাজার থেকে ২০ হাজার মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে ইন্টারনেট ও ফোন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে প্রকৃত চিত্র বাইরে আসেনি। তবে গত পাঁচ দিন পর মঙ্গলবার আংশিকভাবে ফোন সংযোগ চালু হলে অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো ভয়াবহ প্রাণহানির তথ্য প্রকাশ করে।

যদিও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এর আগে নিহতের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম জানিয়েছিল, তারা শুরু থেকেই দাবি করে আসছিল যে প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হবে।

এদিকে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার মঙ্গলবার পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে জানান, তাদের প্রাথমিক হিসেবে অন্তত ২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এ সংখ্যা আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

অন্যদিকে, তেহরানের উপকণ্ঠে একটি মর্গের ভেতরের একটি ভয়াবহ ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা সিবিএস নিউজ যাচাই করে নিশ্চিত করেছে। প্রায় ১৬ মিনিটের ওই ভিডিওতে অন্তত ৩৬৬ থেকে ৪০০টি মৃতদেহ স্তূপ করে রাখা অবস্থায় দেখা যায়। সেখানে ফরেনসিক কর্মীদের মৃতদেহের ওপর গুলির ক্ষত, শটগানের আঘাত ও অন্যান্য গুরুতর জখমের চিহ্ন নথিভুক্ত করতে দেখা গেছে। মর্গজুড়ে ছড়িয়ে থাকা রক্তাক্ত কাপড় ও স্বজনদের আহাজারি নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ইরান সরকার এখনো বিক্ষোভে নিহতদের কোনো নিয়মিত বা আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি। তবে রয়টার্স এক অজ্ঞাতনামা ইরানি কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার হতে পারে। ওই কর্মকর্তা সহিংসতার জন্য বিদেশি মদতপুষ্ট ‘সন্ত্রাসী’ ও ভাড়াটে উসকানিকারীদের দায়ী করেছেন।

এর বিপরীতে নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’-এর প্রধান মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম বলেন, তারা যে তথ্য পাচ্ছেন তা কল্পনাকেও ছাড়িয়ে গেছে। তিনি অভিযোগ করেন, নিরাপত্তা বাহিনী তেহরানের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে গিয়ে আহতদের পরিচয় জানতে চিকিৎসাকর্মীদের হুমকি দিচ্ছে। তার ভাষায়, ইরানকে একটি বিশাল ‘একাকী কারাকক্ষে’ পরিণত করা হয়েছে, যেখানে মানুষকে নির্যাতন ও হত্যা করা হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের দমন-পীড়নের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। মঙ্গলবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বিক্ষোভকারীদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং আশ্বাস দেন যে ‘সাহায্য আসছে’। একই সঙ্গে তিনি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দখলে নেওয়ার আহ্বানও জানান।

হোয়াইট হাউস সূত্রে জানা গেছে, এই সংকট নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা দল সম্ভাব্য সামরিক ও গোপন কৌশল নিয়ে বৈঠক করেছে। পেন্টাগন সূত্র জানায়, প্রথাগত বিমান হামলার বাইরে বিভিন্ন ধরনের সামরিক ও গোয়েন্দা অভিযানের বিকল্প সম্পর্কে ট্রাম্পকে ব্রিফ করা হয়েছে। ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তিনি ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোনো বৈঠকে বসবেন না।

এদিকে নির্বাসিত ইরানি ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভি সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরানি জনগণ এখন কেবল মৌখিক সমর্থন নয়, বরং কার্যকর আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ দেখতে চায়। তার মতে, দ্রুত হস্তক্ষেপ হলে প্রাণহানি কমবে এবং বর্তমান শাসনের পতন ত্বরান্বিত হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থির পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ‘রেসপন্সিবিলিটি টু প্রটেক্ট’—অর্থাৎ বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষার দায়বদ্ধতার বাস্তব প্রয়োগের ওপর নির্ভর করছে।