৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ইসলামি রাজনীতি
সিলেট-৫

জমিয়তের ‘গলার কাঁটা’ বিদ্রোহী প্রার্থী, জনমত জরিপে এগিয়ে দেওয়াল ঘড়ি

জমিয়তের ‘গলার কাঁটা’ বিদ্রোহী প্রার্থী, জনমত জরিপে এগিয়ে দেওয়াল ঘড়ি

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আধ্যাত্মিক রাজধানী সিলেটের সীমান্তঘেঁষা জনপদ সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট) আসনে বইছে তীব্র নির্বাচনী হাওয়া। প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই প্রচার-প্রচারণায় সরগরম এই জনপদ।

নির্বাচনের আর মাত্র ৫ দিন বাকি। তাই সময় যত ঘনিয়ে আসছে, জকিগঞ্জ ও কানাইঘাটের আনাচে-কানাচে প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতি ও উন্নয়নের অঙ্গীকার তত জোরালো হচ্ছে। ভোটারদের মন জয় করতে প্রার্থীরা স্থানীয় সমস্যা সমাধান ও দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের রোডম্যাপ তুলে ধরছেন। ঘুরছের ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। করছেন গণসংযোগ ও সভা-সমাবেশ। দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি।

তবে প্রার্থীদের এই প্রতিশ্রুতির জোয়ারে খুব একটা ভাসছেন না সচেতন ভোটাররা। জকিগঞ্জের এক প্রবীণ ভোটার বলেন, ‘ভোটের আগে সবাই সোনার হরিণ দেখায়। আমরা চাই এমন একজন প্রতিনিধি, যিনি শুধু প্রতিশ্রুতি দেবেন না, বরং নির্বাচনের পর আমাদের পাশে থাকবেন।’

বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের চাওয়া, একটি কর্মসংস্থানমুখী পরিবেশ এবং মাদকমুক্ত সমাজ। প্রার্থীরা তাদের বক্তৃতায় এসব বিষয় যুক্ত করলেও ভোটাররা শেষ পর্যন্ত প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ এবং অতীতের কাজের রেকর্ড দেখেই সিদ্ধান্ত নেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সারা দেশের ৩০০ আসনের মধ্যে সিলেট-৫ একমাত্র আসন, যেটিতে মূল দুটি জোটের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দুজন বরেণ্য আলেম। একজন খেলাফত মজলিস মনোনীয় ও ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের প্রার্থী মুফতি আবুল হাসান (দেওয়াল ঘড়ি), অপরজন জমিয়তের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক (খেজুর গাছ)। তবে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, অনলাইন পোর্টাল ও মাঠ পর্যায়ের জরিপে উঠে আসছে চমকপ্রদ এক তথ্য। সবশেষ পাওয়া জনমত জরিপ অনুযায়ী, জোটবদ্ধ শক্তির জোরে জনপ্রিয়তায় বর্তমানে অনেকটা এগিয়ে রয়েছেন খেলাফত মজলিস মনোনীত ও ১১-দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের প্রার্থী মুফতি আবুল হাসান (দেয়াল ঘড়ি)।

সিলেট-৫ আসনে এবার মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে চতুর্মুখী, তবে মাঠের লড়াই মূলত ত্রিমুখী রূপ নিয়েছে। এখানকার চার প্রার্থী হলেন দেওয়াল ঘড়ি প্রতীকে ১১ দলের মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসান, খেজুর গাছ প্রতীকে বিএনপি-জমিয়ত জোটের মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক, ফুটবল প্রতীকে বিএনপির বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র মামুনুর রশীদ ওরফে চাকসু মামুন,  হারিকেন প্রতীকে বাংলাদেশ মুসলিম লীগের মাওলানা বিলাল উদ্দিন।

 

জমিয়তের ‘গলার কাঁটা’ যখন বিএনপির বিদ্রোহী

বিএনপি এই আসনে সরাসরি কোনো প্রার্থী না দিয়ে জোটসঙ্গী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুককে সমর্থন দিয়েছে। কিন্তু জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মামুনুর রশীদ (চাকসু মামুন) স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ফুটবল প্রতীক নিয়ে মাঠে নামায় হিসাব পাল্টে গেছে। স্থানীয় বিএনপির একটি বড় অংশ দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে চাকসু মামুনের পক্ষে কাজ করছে। এই ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর কারণে জোট প্রার্থী উবায়দুল্লাহ ফারুকের ভোটব্যাংকে বড় ধরনের ফাটল ধরেছে, যা  জমিয়ত প্রার্থীর জন্য ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফুরফুরে মেজাজে মুফতি আবুল হাসান

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীসহ ১১-দলীয় জোটের শরিকরা ঐক্যবদ্ধ থাকায় বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছেন খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুফতি আবুল হাসান। জামায়াতের প্রার্থী আনওয়ার হোসাইন খান প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেওয়ায় জোটের ভোটগুলো এখন এককভাবে দেওয়াল ঘড়ির বাক্সে পড়বে। এছাড়া স্বচ্ছ ইমেজ এবং জোটগত সংহতির কারণে জকিগঞ্জ ও কানাইঘাটের সাধারণ ভোটারদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতাও ক্রমশ বাড়ছে।

এলাকার ভোট বিশ্লেষণ : জয়-পরাজয়ের চাবিকাঠি

মাঠ পর্যায়ের জরিপ অনুযায়ী জকিগঞ্জে ৯টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার প্রায় ৮০ ভাগ ভোট দেওয়াল ঘড়ির দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বারোহালসহ কয়েকটি ইউনিয়নে খেজুর গাছ ও ফুটবলের কিছু প্রভাব থাকলেও আধিপত্য বজায় রাখছেন মুফতি আবুল হাসান।

আর কানাইঘাট উপজেলায় লড়াইটা বেশ হাড্ডাহাড্ডি। দক্ষিণ বাণীগ্রাম মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক ও চাকসু মামুনের এলাকা হওয়ায় সেখানে খেজুর গাছ ও ফুটবলের লড়াই হবে তীব্র। তবে ঝিঙ্গাবাড়িসহ বেশ কিছু ইউনিয়নে দেওয়াল ঘড়ি বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছে।

ফুলতলি ফ্যাক্টর

গত ২৪ সালের আমি-ডামি নির্বাচনে এখান থেকে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করে বিজয়ী হওয়া মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলি এবার নির্বাচনে অংশ নেননি। ফলে ফুলতলী অনুসারীদের বিশাল ভোটব্যাংক এবার কোন দিকে যায়, তার ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু। তাদের সমর্থন আদায় করতে সব প্রার্থীই জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন।

ধারণা করা হচ্ছে, ফুলতলির পীর সাহেদের অরাজনৈতিক সংগঠন আল-ইসলাহের কর্মী-সমর্থকরা নিরংকুশভাবে কাউকে ভোট দেবেন না। ফুটবল, দেওয়াল ঘড়ি ও খেজুর গাছ সব কাক্সেই কমবেশ তাদের ভোট পড়বে। যদিও জমিয়তের প্রার্থী ও তাদের অনুসারীরা দাবি করছেন যে, ফুলতলির ভোট একচেটিয়াভাবে তারাই পাবেন। কিন্তু গত ২৪ সালের নির্বাচন উপলক্ষ্যে মাওলানা হুছামদ্দীন তার নির্বাচনি প্রচারে কানাইঘাট দারুল উলুম মাদরাসায় গেলে সেখানে তাকে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিয়ে হেনস্থা করা হয়। অপরদিকে দেওয়াল ঘড়ির প্রার্থী মুফতি আবুল হাসান একজন স্বজ্জন ও বিতর্কমুক্ত আলেম হিসেবে বেশ সমাদৃত। ফলে ফুলতলির অনুসারীদের ভোট দেওয়াল ঘড়ির পক্ষেই যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।

মুফতি আবুল হাসানের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক মাওলানা মুখলিছুর রহমান বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ, মাঠ আমাদের পক্ষে। জামায়াতসহ জোটের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ। সাধারণ মানুষ পরিবর্তনের জন্য দেয়াল ঘড়িতে ভোট দিতে মুখিয়ে আছে।’

এদিকে স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতাকর্মী বলেন, জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট উপজেলা বিএনপি এবং দলটির অঙ্গসহযোগী সংগঠনের একটা বড় অংশ মামুনুর রশীদের সঙ্গে থেকে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন। ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর সঙ্গে থাকায় ইতিমধ্যে জকিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেনসহ (সেলিম) চারজন এবং কানাইঘাট উপজেলা বিএনপির সহসভাপতিসহ পাঁচজন বহিষ্কৃত হন। আরও কয়েকজনকে বহিষ্কার করা হতে পারে বলে দলের কয়েকজন দায়িত্বশীল নেতা জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বিএনপির এক নেতা বলেন, ‘বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে দলের অনেক নেতা-কর্মী আছেন। শোনা যাচ্ছে, আরও কয়েকজন নেতা বহিষ্কৃত হবেন। তবে নির্বাচনের আগমুহূর্তে দল থেকে তাদের বহিষ্কার না করার কৌশল অবলম্বন করা উচিত ছিল। এভাবে বহিষ্কার করায় এখন বহিষ্কৃতরা আরও সক্রিয়ভাবে জমিয়ত প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছেন। এটা ভোটের মাঠে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।’

স্বাধীনতার পর আসনটিতে চারবার আওয়ামী লীগ, তিনবার জাতীয় পার্টি ও দুবার স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হন। এ ছাড়া বিএনপি, ইসলামী ঐক্যজোট ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী একবার করে জয়ী হয়েছেন। সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোহাম্মদ হুছামুদ্দীন চৌধুরী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন।

এদিকে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় জানিয়েছে, সিলেট-৫ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ২৮ হাজার ৭৪৬ জন। এ ছাড়া পোস্টাল ভোটের জন্য নিবন্ধন করেছেন ৭ হাজার ৯১১ জন ভোটার।

সময় যত ঘনিয়ে আসছে, সিলেট-৫ আসনের লড়াই তত বেশি ‘একপেশে’ হয়ে ওঠার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত দেয়াল ঘড়ির জয়ের ধারা অব্যাহত থাকে নাকি খেজুর গাছ ও ফুটবল কোনো চমক দেখায়—তা দেখার জন্য আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে দেশবাসীকে।