Home » Slide » গোপালের মুদ্রা কি পাওয়া গেছে?

গোপালের মুদ্রা কি পাওয়া গেছে?

অনলাইন ডেস্ক:
প্রথম পালসম্রাট গোপালের কোনও মুদ্রা পাওয়া যায় না, এরকমই কথিত আছে। বস্তুত ধর্মপালের মুদ্রা সম্পর্কেও একই রকম অভাব কথিত ছিল, কিন্তু পঙ্কজ ট্যান্ডন ধর্মপালের স্বর্ণমুদ্রা আবিষ্কার করেন এবং মুদ্রাতত্ত্বের একটি প্রখ্যাত পত্রিকায় সে সম্বন্ধে প্রবন্ধ লিখে সারা বিশ্বকে অবহিত করেন।
বহুদিন ধরে সে মুদ্রাই আমার পাতার কভার ইমেজ। এর আগে যখন প্রোফাইল থেকে কাজ করতাম তখনও ধর্মপালের স্বর্ণমুদ্রাটি আমার কভার ইমেজ ছিল, সেই যে প্রোফাইলটা ফেসবুক কর্তৃপক্ষ ভারতীয় সংসদের নির্বাচনের আগে উড়িয়ে দিলেন। সে যাক।
পঙ্কজ ট্যান্ডন কিন্তু তাঁর ধর্মপাল বিষয়ক প্রবন্ধে আরেকটি চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন: জো ক্রিব (Joe Cribb) নামে এক গবেষককে উদ্ধৃত করে ট্যান্ডন বলেন যে গোপালের স্বর্ণমুদ্রা আছে।
বালমৃগাঙ্ক নামে খ্যাত মুদ্রাগুলো আসলে পালরাজাদের দ্বারা উৎকীর্ণ এবং তার মধ্যে একটি মুদ্রা স্বয়ং পালসম্রাট গোপালের।
অভিনবমৃগাঙ্ক, বঙ্গালমৃগাঙ্ক ও বালমৃগাঙ্ক লেখা একাধিক মুদ্রা পাওয়া গেছে সমতট থেকে। এর মধ্যে অভিনবমৃগাঙ্ক লেখা মুদ্রা উৎকীর্ণ হয়েছিল সমতট শাসক ভবদেব দ্বারা, এবং বঙ্গালমৃগাঙ্ক লেখা মুদ্রা উৎকীর্ণ হয়েছিল তাঁর পিতা আনন্দদেব কর্তৃক। এই দেব রাজারা খড়্গ রাজবংশকে উচ্ছেদ করেছিলেন বলে মনে করা হয়।
বালমৃগাঙ্ক লেখা মুদ্রাগুলি কে বা কারা দিয়েছিলেন, সেটা প্রহেলিকা থেকে গেছিল। এগুলোর সময়কাল মোটামুটি অষ্টম শতক, সেটা অবশ্য জানা যায়।
এই বালমৃগাঙ্ক মুদ্রার একটি আসলে পালসম্রাট গোপালের হতে পারে, ট্যান্ডনের এই দাবি রোমাঞ্চকর।
একটি বালমৃগাঙ্ক মুদ্রা বি এন মুখার্জির গুপ্তপরবর্তী গৌড়বঙ্গের মুদ্রা সংক্রান্ত বইয়ের প্রচ্ছদ (মুখার্জি বলেন যে এই মুদ্রা ময়নামতি থেকে প্রাপ্ত এবং কলকাতায় একজনের ব্যক্তিগত সংগ্রহে রক্ষিত, যেখান থেকে তিনি ছবি নিয়েছেন), এই একই মুদ্রার ছবি পঙ্কজ ট্যান্ডন তাঁর প্রবন্ধেও দিয়েছেন, সে ছবির রেজোলিউশন কিছু উন্নত বলে সেখান থেকেই ছবি দিচ্ছি। এই মুদ্রায় রাজার নামের আদ্যাক্ষর হিসেবে “জয়” লেখা। আর একটি বালমৃগাঙ্ক মুদ্রা পাওয়া যায়, তাতে রাজার নামের প্রথম অক্ষর হিসেবে “দে” লেখা। আর একটি মুদ্রা, নির্মাণশৈলীর দিক থেকে এটিই সবথেকে প্রাচীন মনে হয়, সেখানে রাজার নামের আদ্যাক্ষর হল “গো”।
পঙ্কজ ট্যান্ডন বলছেন যে জো ক্রিব এবং তিনি এই বিষয়ে একমত যে “জয়” মুদ্রাটি জয়পালের (দেবপালের খুড়তুতো ভাই), “দে” নামক মুদ্রাটি সম্ভবত দেবপালের, এবং “গো” উৎকীর্ণ মুদ্রাটি স্বয়ং গোপালের।
বলা দরকার যে এই বালমৃগাঙ্ক মুদ্রার সঙ্গে খড়্গ বংশীয় রাজা বালভট-এর মুদ্রার আশ্চর্য মিলের উল্লেখ করেছেন বি এন মুখার্জি। তাঁর অনুমান যে এই বালমৃগাঙ্ক মুদ্রা যে বা যেসব রাজা দিয়েছেন তাঁরা বালভট – এর সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন।
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী জানিয়েছেন যে গোপালকে রাজভটবংশাদিপতিত বলা হয়েছে। বিষয়টা মিলে যাচ্ছে সেক্ষেত্রে। কারণ বালভট খড়্গবংশীয়। রাজভটও তাই।
এবং সেক্ষেত্রে প্রথম দিকে পালসম্রাটরা বালমৃগাঙ্ক উপাধি ব্যবহার করতেন, সম্ভবত পরে কোনও কারণে সে উপাধি পরিত্যাগ করেন। এ উপাধি সমতট-স্পেসিফিক, এ উপাধি আঞ্চলিক। সমগ্র গৌড়বঙ্গে সাম্রাজ্য গঠিত হওয়ার পরে সেক্ষেত্রে এ উপাধি কিছুটা অপ্রয়োজনীয় হয়ে থাকতে পারে ও অব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে।
বালমৃগাঙ্ক। অর্থাৎ শিশুচন্দ্র। বাঙালির সঙ্গে চন্দ্রের পুরোনো সংযোগ আছে। পালসম্রাট গোপাল চুন্দা বা চুন্দির উপাসনা করতেন যিনি আসলে চন্দ্রদেবী। চণ্ডীর মতই। চণ্ডী শব্দ চন্দ্রী থেকে এসেছে মনে করা হয়।
পালদের সঙ্গে কি তাহলে সমতট অঞ্চলের সংযোগ? হ্যাঁ, খড়্গ বংশের সঙ্গে পালসংযোগ, ময়নামতি থেকে বালমৃগাঙ্ক মুদ্রার প্রাপ্তি – সবই সেদিকে ইঙ্গিত করে। যদিও বরেন্দ্রভূমি পালদের জনকভূ বলে পরিচিত, কিন্তু তার অর্থ পিতৃরাজ্য, আদিভূমি নয়। আদিভূমি সমতট।
ট্যান্ডনের বক্তব্যে আমি একটাই সমস্যা পাচ্ছি, আমি পালযুগে ধর্মপাল ও দেবপালের কোনও শাসনে (জয়পালের কোনও শাসন নেই) বালমৃগাঙ্ক উপাধির উল্লেখ দেখিনি। কিন্তু সমকালের কয়েকজন বিখ্যাত মুদ্রাতাত্ত্বিক যখন ভাবছেন যে এই বালমৃগাঙ্ক উৎকীর্ণ মুদ্রাসমূহের মধ্যে পালসম্রাট গোপালের একটি মুদ্রা থাকতে পারে, সে বক্তব্যের cognisance বাঙালির ইতিহাসচর্চায় নিতে হবে আমাদের, সেজন্য আজকের এই লেখা।
তিনটি বালমৃগাঙ্ক মুদ্রার চিত্রের মধ্যে, দুর্ভাগ্যের কথা, যেটি গোপালের বলে দাবি করেছেন ট্যান্ডন ও ক্রিব, সেটার কোনও ছবি ট্যান্ডনের প্রবন্ধে নেই। গোপালের সম্ভাব্য মুদ্রার একটি অতি অস্পষ্ট ছবি বি এন মুখার্জির বইতে আছে, তিনি যদিও এ মুদ্রাটির গায়ে বঙ্গালমৃগাঙ্ক উৎকীর্ণ বলে দাবি করেন এবং গোপালের সঙ্গে কোনও সংযোগ ঘটান নি, কিন্তু ট্যান্ডন বলছেন, যে এটিই গোপালের মুদ্রা এবং বালমৃগাঙ্ক লেখা। অনুরূপ একটি “গো” লিখিত বালমৃগাঙ্ক মুদ্রার ছবি মিচিনারের বইতে আছে ট্যান্ডন জানান (ল্যান্ড অভ ওয়াটার: কয়েনেজ অ্যান্ড হিস্ট্রি অভ বাংলাদেশ) কিন্তু সে বই খুঁজে পাইনি। মুদ্রাটির উপযুক্ত রেজলিউশনের চিত্র না পেলে বলা অসম্ভব, বালমৃগাঙ্ক না বঙ্গালমৃগাঙ্ক।
যেহেতু বালমৃগাঙ্ক উপাধি ধর্মপাল ও দেবপালের কোনও শাসনে নেই, তাই আমি ট্যান্ডনের এই মতটি গ্রহণ করতে অপারগ যে তিনটি বালমৃগাঙ্ক মুদ্রাই গোপাল দেবপাল ও জয়পালের। ধর্মপালের ও দেবপালের মুদ্রা এর আগে আমরা পেয়েছি, তাতে কিন্তু বালমৃগাঙ্ক লেখা নেই, স্টাইল খানিকটা আলাদা, যদিও অনস্বীকার্য, মিলও আছে, সেই মিলের কথা ট্যান্ডনও বলেছেন।
আমার মনে হয়, দে লিখিত বালমৃগাঙ্ক মুদ্রা দেবখড়্গের হতে পারে। জয় নামে এই খড়্গ বংশেরই অন্য কোনও রাজা থাকতে পারেন।
কিন্তু “গো” লিখিত মুদ্রাটি গোপালের হওয়া একেবারে অসম্ভব নয়। তিনি নিজে বালমৃগাঙ্ক উপাধি নিয়ে প্রথমে সমতট অঞ্চলে সিংহাসনে আরোহণ করে থাকবেন, পরে তিনি প্রকৃতিপুঞ্জ কর্তৃক গৌড়বঙ্গের সিংহাসনে অভিষিক্ত হলে তাঁর পুত্রপৌত্ররা এই আঞ্চলিক উপাধি ত্যাগ করেন।
আর একটি সম্ভাবনা আছে, যদি এই দে এবং জয় যথাক্রমে দেবপাল ও জয়পাল হন: পালরা বিশেষ করে সমতট অঞ্চলে এই মুদ্রা প্রচলন করতেন। এ সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না এই কারণে যে সমতট একটি নিৰ্দিষ্ট স্বর্ণমান মেনে চলত, বৈদেশিক সমুদ্রবাণিজ্যের জন্য এই স্থানের সমৃদ্ধি প্রসিদ্ধ ছিল। শশাঙ্ক পর্যন্ত বাধ্য হয়েছিলেন সমতট অঞ্চলের জন্য পৃথক স্বর্ণমুদ্রা প্রচলনে, যা অন্যান্য অঞ্চলে প্ৰচলিত মুদ্রার থেকে গুণমানে উন্নত ছিল, বি এন মুখার্জির পর্যবেক্ষণ। তাছাড়া আঞ্চলিক প্রসিদ্ধি ছাড়াও পালদের পক্ষে এই উপাধিসংযুক্ত মুদ্রা আলাদাভাবে সমতট অঞ্চলে বহাল রাখার পেছনে আদিভূমির আবেগ সক্রিয় থাকতে পারে।
বলা দরকার যে দে এবং জয় লিখিত বালমৃগাঙ্ক মুদ্রা (বিশেষ করে জয় লিখিত মুদ্রাটি) সত্যিই দেখে মনে হচ্ছে যে এগুলো পরবর্তী কালে উৎকীর্ণ। গো লিখিত বালমৃগাঙ্ক মুদ্রাই এদের তুলনায় প্রাচীন।
গোপালের কোনও শাসন আবিষ্কার হয়নি,এই একটি সম্ভাব্য মুদ্রা ব্যতীত তাঁর অপর কোনও মুদ্রা আবিষ্কার হয় নি। ধর্মপাল থেকে পালযুগের ইতিহাস অনেক ভালোভাবে লিপিবদ্ধ, এই সময় পালগণ কর্তৃক বালমৃগাঙ্ক উপাধি ব্যবহৃত হলে জানা যাওয়া উচিত ছিল।
কিন্তু গোপাল প্রথম যুগে সমতট অঞ্চলে বালমৃগাঙ্ক উপাধি ব্যবহার করতেন, যেহেতু তিনিও খড়্গবংশের একটি গৌণ বা পতিত শাখা থেকে এসেছিলেন, এই অনুমান একেবারে অসঙ্গত নয়। গোপালের পিতা বপ্যট ও পিতামহ দয়িতবিষ্ণুর নামের উল্লেখ আছে ধর্মপালের খালিমপুর শাসনে, এঁরা রাজা ছিলেন না। গোপাল প্রথম সিংহাসনে বসেন। সিংহাসনে বসে তিনি খড়্গ বংশ ও সমতট অঞ্চলের প্রথা অনুসরণ করে এই উপাধি নেন, এ সম্ভাবনা অযৌক্তিক নয়।
অতএব গো লিখিত মুদ্রাটি, যাতে বালমৃগাঙ্ক বা বঙ্গালমৃগাঙ্ক লিখিত, সেটা গোপালের হতে পারে, এই সম্ভাবনা আছে বলে মনে করছি।
ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা এই মুদ্রা কোথায় আছে জানি না, আরও ভালো ছবি পাওয়া যাবে কিনা জানি না। যা পাওয়া যাচ্ছে আপনাদের জানাচ্ছি।
প্রতিটি বালমৃগাঙ্ক মুদ্রায় প্রকৃতিমাতৃকার শ্রী বা লক্ষ্মীরূপের চিত্র আছে, মাতৃকা দ্বিভুজা। কিন্তু গোপালের সম্ভাব্য মুদ্রায় প্রকৃতিমাতৃকা দেখা যাচ্ছে অষ্টভুজা। গোপালের আরাধ্যামাতৃকা চুন্দার রূপকল্পনার সঙ্গে এই অষ্টভুজা মূর্তির সাযুজ্য আছে।
প্রথম ছবি: গোপালের সম্ভাব্য মুদ্রা, গো লেখা। বি এন মুখার্জির বই থেকে নেওয়া ছবি (বি এন মুখার্জি অবশ্য একে গোপালের মুদ্রা বলতে চান নি, সেটা বলছেন পঙ্কজ ট্যান্ডন ও জো ক্রিব)। দ্বিতীয় ছবি: জয় লেখা মুদ্রা। পঙ্কজ ট্যান্ডনের প্রবন্ধ থেকে ছবি। এই বালমৃগাঙ্ক মুদ্রা কোন শাসকের সেটা বি এন মুখার্জি বলতে পারেন নি, যদিও এ ছবিটি তাঁর বইয়ের প্রচ্ছদচিত্র। তৃতীয় ছবি, দে লিখিত বালমৃগাঙ্ক মুদ্রা, এর কোনও আলোচনা বি এন মুখার্জি করেন নি, ট্যান্ডন এই মুদ্রাকে দেবপালের সঙ্গে সংযুক্ত করেন, আমার মতে এটা দেবখড়্গের মুদ্রা হওয়া একেবারে অসম্ভব না। ছবি মিন্টেজওয়ার্ল্ড ডট কম থেকে।
জয়নাগের মুদ্রার চিত্র প্রথমবার আজকের বাঙালির সামনে এনেছিলাম আমি, সেটা ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে জয়গুপ্ত নামে আজও ক্যাটালগড হয়ে আছে। জয়নাগ যে শশাঙ্কের পূর্ববর্তী হতে পারেন, সেটাও জানিয়েছিলাম। আজ গোপালের সম্ভাব্য মুদ্রার এই সীমিত চিত্রটি সম্পর্কে আপনাদের জানালাম। বাঙালির শেকড় অন্বেষণে আমার ও আমাদের অভিযাত্রা চলতে থাকবে।
©তমাল দাশগুপ্ত
সংগ্রহ: উৎপল কান্তি ধর