১৬ জানুয়ারি, ২০২৬

আদর্শের মরীচিকা ও ইসলামি রাজনীতির আত্মঘাতী বিভাজন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কওমি ঘরানার ইসলামি দলগুলোর অবস্থান বরাবরই একটি কৌতূহলপূর্ণ হয়ে থাকে। সম্প্রতি এই দলগুলো তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে বিএনপির সাথে জোটবদ্ধ অংশ, অন্যদিকে জামায়াতের সাথে থাকা খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন ও নেজামে ইসলাম পার্টির মতো দল, অপরদিকে এককভাবে পথ চলা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। তারা এখন ইসলামি ঘরানার তৃতীয় মেরুতে আছে। এটা অবশ্য শক্তিবিবেচনায় নয়, এককেন্দ্রিক হওয়ায় বলছি।

এভাবে দল ও জোটের তালিকা বড় হলেও এই বিভক্তির ফলে তাদের বিজয় অর্জনের সক্ষমতা আজ বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে। সবকিছুর ঊর্ধ্বে আমাদের রাজনৈতিক পরিবেশে সামর্থ্য, আইডিয়া বা বাস্তবতার চেয়ে আবেগই যেন চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগ আর বিচ্ছিন্নতাই শেষ পর্যন্ত সুবর্ণ সুযোগগুলোকে হাতছাড়া করার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিএনপির সাথে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সম্পৃক্ততা দীর্ঘদিনের। বড় দলের সাথে থেকে ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার একটি সম্ভাবনা থাকলেও দিনশেষে আসন ভাগাভাগির ক্ষেত্রে তাদের বরাবরই প্রান্তিক অবস্থানে রাখা হয়। খয়রাতি কিছু আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ দিয়ে তাদের মূলত বড় দলের ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

অন্যদিকে জামায়াত জোটে থাকা খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন এবং নেজামে ইসলাম পার্টির মতো দলগুলো যুগপৎ রাজনীতি ও নির্বাচনে অংশ নিলেও তাদের প্রাপ্তি অত্যন্ত নগণ্য। মাঠ-বাস্তবতাও এমন।

নেতৃত্ব, আদর্শিক সংঘাত এবং কৌশলগত দূরদর্শিতার অভাবে এই দলগুলো এখনো পওয়ার ক্রিয়েট করার মতো যেমন সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি, তেমনি বড় জোটের ছায়ায় নিজেদের স্বাতন্ত্র্যও হারিয়ে ফেলছে ক্রমশ।

পরিণতিতে আমরা দেখতে পাই, একই আসনে একই ঘরানার আলেমদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়ার যে রাজনৈতিক খেলা, তাতে দিনশেষে বড় দলগুলোই সফল হয়। ধর্মীয় ভোটগুলো খণ্ডিত হয়ে মূল্যহীন হয়ে পড়ে।

এই রাজনৈতিক সমীকরণে সবচেয়ে বড় মোড় আসে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একক নির্বাচনের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। জোটবদ্ধ হওয়ার আলোচনা এবং আসন নিয়ে দীর্ঘ দরকষাকষি চললেও শেষ মুহূর্তে পর্যাপ্ত মূল্যায়ন না পাওয়ায় তারা জোট থেকে বেরিয়ে আসার সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়। যদিও আপাত-দৃষ্টিতে তাদের এমন সিদ্ধান্ত কোনো কাজে আসবে বলে মনে হয় না, তবে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরি করেত পারবে।

এককভাবে নির্বাচন করার ব্যাপারে ইসলামী আন্দোলন নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়ার এই চেষ্টা প্রশংসনীয় হলেও বর্তমান নির্বাচনি ব্যবস্থায় এতে সফল হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। পর্যাপ্ত জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও কৌশলগত ঐক্যের অভাবে তাদের এই একলা চলার পথ শেষ পর্যন্ত মরীচিকায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করেছে।

আদর্শ, নীতিনৈতিকতা ও দায়বদ্ধতার পরিবর্তে যখন শুধু ক্ষমতার রাজনীতি মুখ্য হয়ে ওঠে, তখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মধ্যে এক বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়। বড় দলগুলো তাদের অ্যালকোহলযুক্ত পারফিউম আলেমদের পাঞ্জাবিতে মাখিয়ে দিয়ে আভিজাত্যের যে মায়া তৈরি করে, তা মূলত একটি গভীর ফাঁদ। এই সত্যটি বুঝতে না পারার মাশুল দিতে হচ্ছে গোটা কওমি ঘরানাকে। নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিচ্ছিন্নতা এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক দাবি আদায়ে ব্যর্থতা তাদের রাজনীতিকে এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বর্তমানের এই বিভাজন এবং নিজেদের মধ্যে রেষারেষি বজায় থাকলে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে চিৎকার দিয়ে আজান দিলেও নিজ ঘরের মুসল্লিরাও হয়তো আর সেই ডাকে সায় দেবে না। এই অনিবার্য পরিণতি এবং মরীচিকার পেছনে ছোটার অভ্যাস পরিবর্তন করতে না পারলে খেলা শেষে কেবল আফসোসই অবশিষ্ট থাকবে।

সময় এসেছে ক্ষমতার সিঁড়ি হওয়া বন্ধ করে নিজেদের আদর্শিক অবস্থান এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার সমন্বয় ঘটানোর, নতুবা এই সুবর্ণ সুযোগ হারানোর আক্ষেপ চিরকাল বয়ে বেড়াতে হবে।

কওমি ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলোর বর্তমান স্থবিরতা কাটাতে এবং ক্ষমতার সিঁড়ি হওয়া থেকে বাঁচতে প্রথাগত জোটের বাইরে কিছু বিকল্প কৌশল নিয়ে ভাবা যেতে পারে। যদিও এমন পরিবেশ এখন আর নেই। যখন ছিল, সেটা অবারিত সুযোগ ছিল বলা যায়। কিন্তু হয়নি। এটাই আমাদের আফসোসের জায়গা।

৫ আগস্ট-পরবর্তী বাস্তবতায় ইসলামি গলগুলোর প্রথম এবং প্রধান কৌশল হওয়া উচিত ছিল, বৃহত্তর ইসলামী ঐক্য গঠন করা। এই ঐক্য বড় কোনো সেকুলার দলের লেজুড়বৃত্তি না করে নিজেদের একটি স্বতন্ত্র ব্লক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারত।

রাজনৈতিক দরকষাকষির টেবিলে বিচ্ছিন্নভাবে না গিয়ে যদি সবকটি দল একটি নির্দিষ্ট ও অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে কথা বলতে পারত, তখন বড় দলগুলো তাদের গুরুত্ব দিতে বাধ্য হতো। এতে করে একই আসনে একাধিক আলেম প্রার্থী হওয়ার যে আত্মঘাতী প্রবণতা, তা বন্ধ করা যেমন সম্ভব হতো, তেমনি ভোটের রাজনীতিতে সময়, অর্থ ও মেধার অপচয় রোধ করা যেত।

যাইহোক, বর্তমান বাস্তবতায় ইসলামি গলগুলোর নিজেদের জোট নিয়ে এগিয়ে যাওয়া উচিত। প্রতিপক্ষের সমালোচনা না করে নিজেদের নিয়ে ফিকির করা দরকার।

নির্বাচনের পরে ইসলামি দলগুলোকে কেবল নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে জনমুখী এজেন্ডা হাতে নিতে হবে। রাজনীতিকে ‘পার্ট টাইম’ পেশা না বানিয়ে ‘ফুল টাইম’ করতে হবে। তবেই আপনি জনতার নেতা পারবেন। সাধারণ মানুষের রুটি-রুজির লড়াই, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার আন্দোলনে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি।

বর্তমানে সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ মনে করে ইসলামি দলগুলো কেবল ধর্মীয় ইস্যু বা নির্বাচন এলে সক্রিয় হয়। এই ধারণা পাল্টাতে হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তার মতো জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিকল্প খসড়া বা ইশতেহার জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে।

যখন সাধারণ মানুষ দেখবে যে আলেমদের রাজনীতি পরকালের পাশাপাশি ইহকালীন সংকটেও পাশে দাঁড়াচ্ছে, তখনই তাদের প্রতি জনসমর্থন তৈরি হবে। নির্দিষ্ট বলয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে গণমানুষের ভোটব্যাংকে পরিণত হবে।

শুধু আবেগ দিয়ে বর্তমানের জটিল রাজনীতিতে টিকে থাকা অসম্ভব। মেধা ও আধুনিক কৌশলের সমন্বয় ঘটানো অপরিহার্য। দলগুলোর অভ্যন্তরে একটি শক্তিশালী থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক বা গবেষণা সেল গঠন করা প্রয়োজন, যারা দেশি-বিদেশি ভূ-রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দলের নীতি নির্ধারণ করবে।

বড় দলগুলোর দেওয়া ‘খয়রাতি আসনের’ মুলা উপেক্ষা করে নিজেদের অন্তত পঞ্চাশ থেকে একশটি আসনে এমনভাবে শক্তিশালী করতে হবে, যেন ওই আসনগুলোতে অন্য কোনো দল তাদের ছাড়া জয়ের কথা ভাবতে না পারে। এই কৌশলগত অবস্থান তৈরি করতে পারলে জোটভুক্ত হওয়া বা না হওয়া নিয়ে কারও করুণার অপেক্ষায় থাকতে হবে না।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, নেতৃত্বের বিন্যাস এবং তরুণ প্রজন্মকে সামনে আনা জরুরি। কওমি ঘরানার বর্তমান তরুণরা অনেক বেশি সচেতন। তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা এবং নেতৃত্বে জায়গা করে দিলে রাজনীতির মাঠের ভাষ্য পাল্টে যেতে পারে। আদর্শের প্রশ্নে আপসহীন থেকে যদি বাস্তবসম্মত এবং জনসম্পৃক্ত রাজনীতি গ্রহণ করা যায়, তবেই কেবল মরীচিকার পেছনে ছোটা বন্ধ হবে। এই আমূল পরিবর্তন না এলে বিচ্ছিন্নতা আর ধ্বংসের যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন হবে।

কওমি ঘরানার বর্তমান নেতৃত্বে যারা আছেন, তাদের ত্যাগ, ইলমি গভীরতা এবং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা অনস্বীকার্য। কিন্তু আধুনিক গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে শুধু ধর্মীয় পাণ্ডিত্য বা ব্যক্তিগত কারিশমা বিজয়ী হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। বর্তমান নেতৃত্বের একটি বড় অংশ দীর্ঘকাল ধরে বড় দলগুলোর সাথে জোটবদ্ধ রাজনীতি করে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন, যার ফলে তাদের চিন্তা ও কৌশলের মধ্যে এক ধরনের স্থবিরতা চলে এসেছে। তারা বারবার একই বৃত্তে আবর্তিত হচ্ছেন এবং বড় দলগুলোর সাজানো ছকের বাইরে বের হতে পারছেন না।

এই স্থবিরতা কাটাতে হলে নেতৃত্বে পরিবর্তনের চেয়েও বেশি প্রয়োজন নেতৃত্বের ধরনে পরিবর্তন আনা। বর্তমান প্রবীণ নেতৃত্বের অভিজ্ঞতার ছায়া ঠিক রেখে যদি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তরুণ, শিক্ষিত এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন প্রজন্মকে জায়গা করে দেওয়া যায়, তবেই কেবল আমূল পরিবর্তন সম্ভব।

এই নতুন প্রজন্মের মধ্যে যারা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং ভূ-রাজনীতি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখেন, তাদের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিতে হবে। কারণ, বর্তমান বিশ্ব ও দেশের রাজনীতি যে ভাষায় কথা বলে, সেই ভাষা এবং কৌশল প্রবীণদের চেয়ে তরুণদের কাছে বেশি স্পষ্ট।

নতুন নেতৃত্বের উত্থান মানে প্রবীণদের একেবারে সরিয়ে দেওয়া নয়। এটি একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া। প্রবীণরা থাকবেন অভিভাবক হিসেবে, আর তরুণরা হবে রাজনীতির মাঠের মূল কারিগর। নতুন নেতৃত্বকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যারা আবেগের চেয়ে যুক্তিতে বিশ্বাসী এবং যারা বড় দলের ‘পারফিউম’ বা সাময়িক আশ্বাসে ভুলে যাওয়ার পাত্র নন। তারা বুঝতে শিখবেন, রাজনীতি কেবল ভোটের দিনে প্রার্থী হওয়া নয়; বরং বছরের ৩৬৫ দিনই জনগণের সুখ-দুঃখের অংশীদার হওয়া।

যদি বর্তমান নেতৃত্ব নতুনদের জন্য পথ প্রশস্ত করে না দেয় এবং নিজেদের পুরোনো ও ব্যর্থ কৌশলগুলো আঁকড়ে ধরে থাকে, তবে এই ঘরানার রাজনীতির ভবিষ্যৎ আরও সংকুচিত হয়ে পড়বে। সময়ের দাবি হলো এমন এক নেতৃত্বের, যারা নিজেদের বিচ্ছিন্নতা দূর করে সব মতভেদের ঊর্ধ্বে উঠে একটি অভিন্ন লক্ষ্য স্থির করতে পারবেন। এই পরিবর্তন যদি ভেতর থেকে না আসে, তবে সাধারণ মানুষের কাছে এই দলগুলোর গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে যাবে এবং তারা কেবল ইতিহাসের সাক্ষী হয়েই টিকে থাকবে। তাই টিকে থাকার লড়াইয়ে যোগ্য ও আধুনিক মানসম্পন্ন নেতৃত্বের বিকল্প নেই।

Home R3