রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই, তবে আদর্শিক মিলের চেয়ে যখন নির্বাচনী স্বার্থ বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন ফাটল ধরাটা স্বাভাবিক। জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনসহ ১১ দলের জোটে এখন সেই চিত্রই স্পষ্ট।
‘ওয়ান বক্স পলিসি’ বা ইসলামী দলগুলোর এক বাক্সে ভোট দেওয়ার যে স্লোগান নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল, আসন ভাগাভাগির দ্বন্দ্বে তা এখন খাদের কিনারে।
জামায়াতের একক আধিপত্য ও শরিকদের অসন্তোষ জোটের মূল সংকট তৈরি হয়েছে জামায়াতের ‘একমুখী সিদ্ধান্ত’ এবং আসন ছাড় না দেওয়ার মানসিকতা থেকে। অপরদিকে চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন ৭০টি আসন চাইলেও জামায়াত ৪০টির বেশি ছাড় দিতে নারাজ। এমনকি বরিশালের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ নেতার বিপরীতেও জামায়াত প্রার্থী রেখেছে, যা চরমোনাই পীরের দলকে রাজনৈতিকভাবে একরকম অপমানিত করা হচ্ছে।
শুধু আসন নয়, এনসিপি বা এলডিপির মতো দলগুলোকে জোটে ভেড়ানোর আগে অন্য শরিকদের সাথে আলোচনার প্রয়োজন বোধ করেনি জামায়াত। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে তারা নিজেদের সর্বেসর্বা ভাবছে। আদতে কি তা-ই? মনে হয় না।
জোটভুক্ত দলগুলো বলছে, এটা জামায়াতের আধিপত্যবাদী আচরণেরই বহিঃপ্রকাশ।
আস্থার সংকট ও রাজনৈতিক সমীকরণ সংকট শুধু আসনের সংখ্যায় নয়; বিশ্বাসেও ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বিএনপির সাথে জামায়াত আমিরের একক বৈঠক জোটের অন্য দলগুলোকে ক্ষুব্ধ করেছে।
শরিকদের মনে এই ধারণা প্রবল হচ্ছে যে, জামায়াত আসলে অন্য দলগুলোকে কেবল তাদের নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। রাজনৈতিক নীতিমালার অভাব এবং একক সিদ্ধান্তের ফলে ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসের মতো দলগুলো এখন নিজেদের সম্মান রক্ষায় বিকল্প চিন্তা করতে বাধ্য হচ্ছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও খেলাফত মজলিস এখন এক কঠিন রাজনৈতিক সমীকরণের সামনে। পড়েছে মাইনকা চিপায়। একদিকে জোটে থাকলে জামায়াতের ‘বড় ভাই’ সুলভ আচরণের শিকার হতে হচ্ছে, অন্যদিকে জোট থেকে বেরিয়ে গেলে একক শক্তিতে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া চ্যালেঞ্জিং।
তৃণমূলের চাপ এবং আত্মসম্মান রক্ষার তাগিদে তারা এখন কোণঠাসা। ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের বক্তব্যে জোট ভাঙার যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তা মূলত জামায়াতের ‘অতি আত্মবিশ্বাসী’ মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ।
আগামী ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময়। এর মধ্যেই স্পষ্ট হবে এই ১১ দলীয় জোট টিকবে নাকি ভাঙবে। তবে যদি শেষ মুহূর্তে কোনো সমঝোতা হয়ও, দলগুলোর মধ্যকার যে ‘অবিশ্বাস’ ও ‘আস্থার সংকট’ তৈরি হয়েছে, তা মিটে যাওয়া সহজ নয়।
মনস্তাত্ত্বিক এই ফাটল নিয়ে নির্বাচনে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করা প্রায় অসম্ভব। দিনশেষে জামায়াতের নমনীয়তা এবং শরিকদের আত্মসম্মানের লড়াই-ই নির্ধারণ করবে এই জোটের আয়ু।
এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কর্মীদের মধ্যে অনলাইনে যে বিদ্বেষপূর্ণ লেখালেখি বা ‘কীবোর্ড ওয়ার’ চলছে, দেশের ইসলামপন্থি রাজনীতিতে তা এক নেতিবাচক দিক হিসেবে প্রকট হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনের আকিদাগত পার্থক্য এবং বর্তমান নির্বাচনী আসন সমঝোতাকে কেন্দ্র করে এই তিক্ততা এখন চরমে।
জামায়াত কর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময় এমনভাবে প্রচার চালান যে, যেন তারাই একমাত্র সুসংগঠিত শক্তি। অন্যদিকে, ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা মনে করেন মাঠপর্যায়ে তাদের জনবল এবং পীর সাহেবের অনুসারীদের সংখ্যা এখন জামায়াতের চেয়েও বেশি বা সমপর্যায়ের। এই ‘কে বড় শক্তি’ তা প্রমাণ করার লড়াই অনলাইন বিতণ্ডাকে ব্যক্তিগত আক্রমণের পর্যায়ে নিয়ে যায়।
মৌদুদিবাদ বনাম কওমিই ঘরানার দীর্ঘদিনের ধর্মীয় মতপার্থক্যকে কর্মীরা এখন ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। জামায়াতকে ‘মওদুদি’ বলে আক্রমণ করা এবং পাল্টা জবাবে ইসলামী আন্দোলনকে ‘পীরপূজারি’ বলে কটাক্ষ করাটার ঘটনাও ঘটছে। রাজনীতির ময়দানের লড়াই যখন ধর্মীয় তকমা দিয়ে করা হয়, তখন তা সাধারণ সমর্থকদের মধ্যে আরও বেশি ঘৃণা ছড়ায়। এই দায় থেকে কেউ মুক্ত নয়।
সবচেয়ে বেশি বিদ্বেষ দেখা যায় একে অপরকে অন্য বড় রাজনৈতিক দলের (আওয়ামী লীগ বা বিএনপি) ‘বি-টিম’ বা ‘দালাল’ প্রমাণের চেষ্টায়। জামায়াত যখন বিএনপির কাছাকাছি যায়, তখন ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা তাদের সমালোচনা করেন। আবার ইসলামী আন্দোলন যখন এককভাবে চলার চেষ্টা করে, তখন জামায়াত কর্মীরা তাদের ওপর ‘ভা/রতের সাথে আঁতাদতের’ অপবাদ চাপিয়ে দেন।
দুই দলের কর্মীরাই একে অপরের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ট্রল করছেন। বিশেষ করে চরমোনাই পীর এবং জামায়াতের বর্তমান আমিরের বিভিন্ন বক্তব্যকে খণ্ডিতভাবে উপস্থাপন করে হাসাহাসি করা হচ্ছে।
অনলাইনে এই চরম বিদ্বেষের ফলে সাধারণ মানুষ ইসলামপন্থী দলগুলোর প্রতি বীতশ্রদ্ধ হচ্ছে। এতে করে বৃহত্তর ঐক্যের যে স্বপ্ন নেতারা দেখান, কর্মীদের আচরণ তার উল্টো প্রতিফলন ঘটায়।
দুই পক্ষের এই মারামারি থেকে অন্য রাজনৈতিক দলগুলো ফায়দা লুটে নেয়। যখন দুই দল একে অপরের ভুল ধরতে ব্যস্ত থাকে, তখন তাদের সম্মিলিত দাবিগুলো গুরুত্ব হারায়। বিশেষত জমিয়তকর্মীদের আস্ফালন দেখে মনে হয়, যেন তারা ঈদের আমেজে আছেন। ভূয়া ফটোকার্ড বানিয়ে ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসের নেতাদের ওপর অপবাদ, চরিত্রহনন করছেন।
নেতৃত্ব পর্যায়ে জোট বা সমঝোতার কথা চললেও তৃণমূল কর্মীদের এই অনলাইন বিদ্বেষ প্রমাণ করে যে, তাদের মধ্যে মানসিক দূরত্ব অনেক গভীরে। সুস্থ রাজনীতির স্বার্থে এবং আদর্শিক লড়াই টিকিয়ে রাখতে সব দলেরই কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগ থেকে কর্মীদের সংযত হওয়ার কড়া নির্দেশনা দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
অপরদিকে, গত ১৭ বছর যারা ফ্যাসিবাদের ছায়ায় ছিলেন, তোষামোদ করেছেন, চরম ‘জামায়াত বিদ্বেষ’ দেখাতে গিয়ে চিহ্নিত কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানও উঠেপড়ে লেগেছে। বিশেষত মাওলানা দেলওয়ার হুসােইন সাইফি (যিনি ৪ দলীয় জোট সরকারের আমলে জামায়াত কর্কৃত নিপীড়নের স্বীকার হয়েছিলেন) ও তাঁর অনুসারী এবং রিজওয়ান রফিকি ও জমিয়তের কিছু নেতাকর্মী জামায়াতবিরোধিতার নামে জামায়াত জোটভুক্ত অপরাপর ইসলামি দলগুলোর যে খোল্লামখোলা সমালোচনা করেছেন, ইনসাফের দৃষ্টিতে তা কতটুকু সত্য ও সঠিক, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।