১১ জানুয়ারি, ২০২৬

খেলাফত মজলিস : নেতৃত্বের স্থবিরতা নাকি…
একটি রাজনৈতিক দল যখন নিজেকে ‘জনমানুষের দল’ হিসেবে দাবি করে এবং পারিবারিক বা পির-কেন্দ্রিক রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকার ঘোষণা দেয়, তখন সেই দলের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা এবং গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ থাকার কথা ছিল না। ইসলামি দলগুলোর মধ্যে মিডিয়া ট্রায়াল এবং মাঠ-বাস্তবতায় তাদের অবস্থান হওয়ার কথা ছিল উল্লেখযোগ্য। নানা সৃজনশীল করণে।
অথচ মিডিয়া এখনো ‘খেলাফত মজলিস’কে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ‘বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস’কে ‘খেলাফত মজলিশ’ বানিয়ে খিচুড়ি করে ফেলে। এই দায় কি শুধু ‘ইসলামি রাজনীতি’ নিয়ে কাজ করা সাংবাদিকদের, নাকি সংশ্লিষ্ট দলগুলোর?
বলছি, খেলাফত মজলিসের কথা। ১৯৮৯ থেকে ২০২৬—পঁয়ত্রিশোর্ধ্ব এই রাজনৈতিক দলটি এখনো রুটিন ওয়ার্ক কাজের বাইরে ‘জনমানুষের দল’ কেন হয়ে উঠতে পারল না, সেটা বিস্ময়কর। অথচ মেধা, যোগ্যতা, কর্মস্পৃহা এবং ত্রিধারার জনশক্তির মিশেলে সংগঠনটি শীর্ষ ইসলামি দল হওয়ার কথা ছিল। সুযোগও ছিল।
একই কথা খাটে ইসলামি আন্দোলনের ক্ষেত্রেও। তারা একে তো ‘পির-কেন্দ্রিক’ দল, তার ওপর পরিবারকেন্দ্রিকও। এবং শীর্ষ নেতৃত্ব যথারীতি যুগ যুগ ধরে একই ফ্রেমে বহাল।
বস্তুত, যেকোনো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলে নির্দিষ্ট সময় পর পর নেতৃত্ব পরিবর্তন হওয়া অত্যাবশ্যক। নেতৃত্ব পরিবর্তন না হলে নতুন আইডিয়া বা নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয় না।
দীর্ঘ ২১ বছর ধরে খেলাফত মজলিসের মহাসচিব পদে একজনই থাকলে সাংগঠনিক স্থবিরতার কথাই তো আমাদের জানান দেয়। মুহতারাম মহাসচিবের গুণমুগ্ধ আমি। তাঁর মেধা, ত্যাগ ও আদর্শ অবশ্যই সম্মান ও অনুসরণযোগ্য। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে তিনি দলের তৃণমূলে ‘আবেগ’ ছাড়া আর কী দিতে পেরেছেন? ২০০৫-পূর্ব বিপ্লবের সেই স্প্রিট কি এখনো আছে? মনে হয় না। ফলাফল হলো, এতে করে মেধাবী তরুণ ও যোগ্য কর্মীদের এগিয়ে আসার পথও রুদ্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।
খেলাফত মজলিস যেহেতু কোনো ‘পির-পরিবার-কেন্দ্রিক‘ বা ‘ওয়ান ম্যান পার্টি’ নয়; কিংবা ‘খাঁটি জুব্বাওয়ালা’ দল নয়, তাই এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। একজন মহাসচিবকে কেন দুই দশকের বেশি সময় একই পদে থাকতে হবে অথবা রাখতে হবে? দীর্ঘ এই সময়ে কেন দ্বিতীয় কোনো নেতৃত্ব কেন তৈরি হলো না?
একজন নেতার সাফল্য পরিমাপ করা হয় মূলত তার দলের ব্যাপ্তি এবং জনসমর্থনের গ্রাফ দেখে। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, এই দীর্ঘ সময়ে দলের মার্কা বা নাম দেশের কত শতাংশ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পেরেছে? কেবল রুটিনওয়ার্ক কাজ করে জনপরিসরে কতটুকু প্রভাব ফেলতে পেরেছে দলটি।
ফ্যাসিস্ট আমলে ইসলামী আন্দোলন স্রোতের অনুকূলে গা ভাসিয়ে হলেও নিজেদের পরিচিতি কিছুটা বাড়িয়ে নিতে পেরেছে, এটা যেমন সত্য, তেমনি হাসিনার আমলে তাদের স্বাচ্ছন্দ্যের রাজনীতিও ছিল প্রশ্নের মুখে। তবু যাই হোক, পরিস্থিতি বোঝে কিংবা ‘ভেতরের রাজনীতি’ করে হলেও তো তারা এগিয়ে যেতে পেরেছে। যদিও জামায়াতের কাছে তাদের ‘রাজনৈতিক হার’টা অপ্রত্যাশিত।
ত্রিধারার (জেনারেল, কওমি ও আলিয়া) সংগঠন খেলাফত মজলিস কিংবা নিরেট হুজুরদের দল জমিয়ত আওয়ামী আমলে তীব্র রোষানলে ছিল এটা ঠিক। কিন্তু চাইলে তারাও অনেক কিছু করতে পারত।
আমরা যারা ‘রাজনীতি’তে সক্রিয় নই; তারা শুধু শুধু জামায়াত, জমিয়ত আর চরমোনাই পিরের দলের দোষ ধরি, নিরেট জমিয়তি ছাড়া আর কারও পক্ষ থেকে খেলাফত মজলিসের প্রতি সাধারণত কেউ ‘চোখ’ ওঠাতে পারে না। সুযোগ থাকে না আসলে। অথচ সম্ভাবনা এবং ৯৫ ভাগ প্রশিক্ষিত ও মার্জিত স্বভাবের কর্মী-সমর্থক থাকা সত্ত্বেও দলটির গ্রাফ কখনোই আশাজাগানিয়া ঊর্ধ্বমুখী ছিল না।
ভাঙন-পরবর্তী দুই দশকেও নির্বাচনী রাজনীতি বা রাজপথের আন্দোলনে খেলাফত মজলিসের অবস্থান আগের চেয়ে কতটা সংহত হয়েছে? যদি গত ২১ বছরে দলের পরিধি দৃশ্যমানভাবে না বাড়ে, তবে এই ব্যর্থতার দায়ভার দীর্ঘমেয়াদী নেতৃত্বকেই নিতে হবে। কর্মীদের আবেগ আর ত্যাগকে কেবল টিকিয়ে রাখার নাম রাজনীতি হতে পারে না।
২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে এক নতুন রাজনৈতিক শক্তির আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। মানুষ এখন প্রচলিত জোট বা চেনা ছকের রাজনীতির বাইরে গিয়ে নতুন বিকল্প খুঁজছে। এই সময়েও যদি দল কেবল নির্বাচনি সমঝোতা বা জোটের সমীকরণে আটকা পড়ে থাকে, তবে তা কর্মীদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে এক ধরনের বেখেয়ালিপনা।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (ওয়ান ম্যান পার্টি) যেখানে একক শক্তিতে দৃশ্যমান হওয়ার চেষ্টা করছে, অথচ কিছুদিন আগেও অনেকেই আশঙ্কা করছিলেন, বাখেম আদতে বিলুপ্ত হওয়ার পথে, রাজনীতিতে তাদের আবেদন-অবদান আসলে কোনো কাজে আসবে না, সেই দলটিই ইবনে শায়খুল হাদিসের জনপ্রিয়তা পুঁজি করে বাহ্যদৃষ্টিতে হলেও অনেক এগিয়ে গেল। অথচ মাঠকর্মী এবং সাংগঠনিক সক্ষমতা—খেলাফত মজলিসের ধারেকাছেও নেই দলটি। কিন্তু মিডিয়া এবং ফোকাস রাজনীতিতে সেই তারা খেলাফত মজলিসের সামনে বেড়ে গেল।
নির্বাচন আসন্ন। অথচ মনে হচ্ছে, নেতাকর্মীদের শৃঙ্খলার দোহাই দিয়ে তাদের রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে কোনো সুবিধাবাদী জোটের স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে।
হাজার হাজার নেতাকর্মী তাদের জীবন ও যৌবন উৎসর্গ করছেন এই দলটির রাজনৈতিক আদর্শের পেছনে। শাহাদাতের ঘটনাও আছে। তাদের এই ত্যাগের প্রতি নেতৃত্বের দায়বদ্ধতা থাকা উচিত ছিল।
মানুষের কাছে পৌঁছাতে না পারা, নতুন ভোটারদের আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হওয়া এবং স্ট্রাটেজিক ভুলগুলোকে আড়াল করার সুযোগ আর নেই। হয় রাজনীতির কৌশল পরিবর্তন করতে হবে, নয়তো নতুন নেতৃত্বের হাতে দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে দলকে মুক্তি দিতে হবে।
রাজনীতি কেবল ক্ষমতা বা পদ আঁকড়ে থাকার নাম নয়; এটি জনগণের আকাঙ্ক্ষা বোঝার শিল্প। খেলাফত মজলিসের বর্তমান নেতৃত্বের সামনে এখন বড় পরীক্ষা—তারা কি ইতিহাসের পাতায় স্থবিরতার প্রতীক হয়ে থাকবেন, নাকি সময়োপযোগী পরিবর্তনের মাধ্যমে কর্মীদের আবেগের মর্যাদা দেবেন?