এক.
নতুন প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কারিশমা, সাদাসিধে পোশাক ও চালচলন, আন্তরিকতা ও প্রচেষ্টায় যা কিছু অর্জিত হচ্ছে, তা যেন দু-একটি ভুল নিয়োগ এবং দু-একটি ভুল আস্থার কারণে শুরুতেই প্রশ্নের মুখে পড়ে না যায়। এদিকে তার সতর্ক দৃষ্টিটা রাখা খুব দরকার।
দুই.
দেশের ভেতরের মিত্র ও শত্রুর জায়গা চিনতে পারা এবং যথাযথভাবে তাদের পরিণতি চিহ্নিত করতে পারাটা গুরুত্বপূর্ণ। ১৭ বছরের অত্যাচারী পলাতক গোষ্ঠী কিংবা নবাগত কোনো অত্যাচারীকে দাঁড়াতে না দেওয়াটা নির্বাচিত সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। গত দুদিন ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিষিদ্ধ দলের কার্যালয় খোলার দৃশ্যগুলো মানুষ ভালো চোখে দেখছে না। জুলাই অভ্যুত্থান ঘটিত আবেগ ও বাস্তবতার কারণে এজাতীয় ইস্যু জনগণ পর্যায়ে বড় রকম ক্ষোভের কারণ ঘটাতে পারে।
তিন.
নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়েছে, যারা প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা। এদের মধ্য থেকে একজনকে দলের ভেতরের এবং বাইরের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের (বিশেষভাবে প্রতিমন্ত্রীদের) রাজনৈতিক আচরণ ও বক্তব্য গাইড/নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। এটা খুব দরকার। তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় নিয়ে ভাববেন না, কিন্তু ওই ব্যক্তিদের এক্সপ্রেশন ও বক্তব্য দেখবেন ধরবেন থামাবেন। নজরুল ইসলাম খান সম্ভবত এ কাজে ভালো করবেন।
চার.
মন্ত্রীদেরকে বাড়তি কথা বলতে নিষেধ করে দেওয়া উচিত। মুখ খুললেই মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ায় খোরাক তৈরি হয়। জুলাই অভ্যুত্থান সম্পর্কে কথায় আচরণে স্পষ্ট ইতিবাচক অবস্থান থাকা দরকার। মৌলিক আরো কয়েকটি বিষয় নিয়ে মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী এবং দলের এমপি ও অন্যান্য নেতাদের অভ্যন্তরীণ পরিশীলন ও চর্চা দরকার। যেন নেতাদের উপলব্ধি ও অভিব্যক্তির ধরনটা এক রকম হয়।
পাঁচ.
বড় পোর্টফোলিও কিংবা বড় বাজেটের এক বা একাধিক মন্ত্রণালয় আর্থিকভাবে বিতর্কিত কোনো ব্যক্তিকে দেওয়া উচিত না। দিলেও তদারকিহীন-ভাবে সেখানে রেখে দেওয়া উচিত না। কারণ এতে ভেতরে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলেও বাইরে সবসময় নেতিবাচক চর্চা চালু থাকবে। আদর্শ ও ন্যারিটিভের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় অত্যন্ত সচেতন ব্যক্তিদের দিকে নিয়ে আসা উচিত। যেমন: শিক্ষা, সংস্কৃতি, তথ্য, নারী।
ছয়.
এটা বিএনপি’র একটা সমস্যা, যখন শুধু মূলধারার মিডিয়া সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতো তখন মিডিয়ায় তাদের প্রভাব খুব কম ছিল। এখন যখন সোশ্যাল মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণ অনেক প্রবল তখন এখানে বিএনপির ভালো মনোযোগ নেই। এ জায়গাগুলোতে নানান উপায়ে ভালো মনোযোগ দরকার। এদিকে মনোযোগ না থাকলে কাজ করতে পারলেও কিংবা না পারলেও এখানে হেরে বসে থাকতে হবে। বাস্তব কিংবা ফেইক প্রচারের ধাক্কা সামাল দেওয়া কঠিন হবে।
সাত.
সরকার গঠনের একদম শুরু সময়েই মন্ত্রিসভার আয়তন এতটা বড় করার সম্ভবত দরকার ছিল না। এতে দল ও কোয়ালিশনের ‘মন্ত্রী হতে না পারা’ নবীন-প্রবীণ অনেকের ভেতরে আক্ষেপ তৈরি হয়েছে। ছোট সাইজের মন্ত্রিসভা হলে সম্ভবত অনেকের মধ্যে বঞ্চিত-বোধ কাজ করত না। মন্ত্রিসভার সাইজ বড় হওয়ায় দলের প্রবীণ ও মাঝারি সারির এবং শরিক দলের মিলিয়ে অন্তত ৪০/৫০ জনের মধ্যে মন্ত্রী না হতে পারার বঞ্চনা-বোধ ও দূরত্ব-অভিমান কাজ করতে থাকার কথা। এই দূরত্ব ও মান অভিমানের ব্যাপারটা খুব খেয়াল করে চেক দিতে হবে বলেই মনে হচ্ছে।
মনোনয়ন পেয়ে শরিক দলের নেতা এমপিও হবে, মন্ত্রীও হবে-এটা এবারই প্রথম হলো; বিএনপি’র ক্ষেত্রে। দলের বাইরে কিছু প্রতিমন্ত্রীকে এবারও এমপি হিসেবেই রেখে দেওয়া যেত। সামনে মন্ত্রীর সংখ্যা বাড়িয়ে নাকি কমিয়ে কিভাবে ভারসাম্য আনা হবে সেটা এখন থেকেই চিন্তা করতে হবে। বাড়ানোটা শৃঙ্খলা ও ঐতিহ্যের দিক থেকে একটা বড় সমস্যা।
কোয়ালিশন সরকারের মন্ত্রিসভার ক্ষেত্রে ২০০১-০৬ আমলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া যেটা করেছিলেন, শরিক দলগুলোর মধ্যে যাদেরকে মনোনয়ন দিয়েছিলেন নির্বাচিত হলে কিংবা না হলে তাদের কাউকে আর মন্ত্রীত্বে নেওয়া হয়নি। শুধু মতিউর রহমান নিজামী ছাড়া। আলী আহসান মুজাহিদকে মন্ত্রিত্ব দেওয়া হয়েছিল, নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। মুফতি আমিনী সাহেব রহ.-কে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল, মন্ত্রিত্ব দেওয়া হয়নি। এমনকি শরিকদের জন্য কিংবা নবাগতদের জন্য দলের (বিএনপি) পুরনো যে নেতাদের আসন ছেড়ে দিতে হয়েছিল, সেই নেতাদেরকে পরে মন্ত্রিত্ব দেওয়া হয়েছিল; যেমন সরাইলে আব্দুস সাত্তার উকিল, নোয়াখালীতে বরকতউল্লাহ ভুলু।
[অব্যক্ত ও অপ্রকাশ্য এই জটিলতাগুলোর দিকে অবশ্যই নতুন প্রধানমন্ত্রীকে খেয়াল রাখতে হবে। বিএনপির রাজনীতিতে দলের ভেতরের ক্ষোভ ও অভিমান কিছু নেতিবাচক ঘটনার জন্ম দিয়েছে, অতীতের বিভিন্ন ধাপে। পেছনের সেই অশোভন ধারাটাকে আগাতে দেওয়া মোটেও ঠিক হবে না।]