২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

আদালতের রায়ের পর বিশ্বব্যাপী নতুন ১০ শতাংশ শুল্কারোপ ট্রাম্পের

বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিভিন্ন হারে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তকে অবৈধ বলে উল্লেখ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট। শুক্রবার দেশটির সুপ্রিম কোর্ট এ সংক্রান্ত একটি রুল জারি করেছে। এতে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক শুল্ক আরোপ করে ফেডারেল আইন লঙ্ঘন করেছেন। এর ফলে পররাষ্ট্র নীতি ও অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়বে। আদালতের এই রুলের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি পাল্টা শুল্কের বদলে নতুন করে বিশ্বব্যাপী ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের নির্বাহী আদেশে সই করেছেন। নতুন এ শুল্ক মঙ্গলবার থেকে কার্যকর হবে।

শুক্রবার সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এ তথ্য জানান। তিনি ওভাল অফিসে বসে এই নির্বাহী আদেশে সই করেছেন। তিনি জানান, এই আদেশ ‘প্রায় তাৎক্ষণিকভাবেই’ কার্যকর হবে। বিবিসি জানিয়েছে, বিচারকরা গত বছর হোয়াইট হাউসে ঘোষিত তার বৈশ্বিক শুল্কের বেশিরভাগকে বেআইনি ঘোষণা করার কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট অন্য আইনের বলে তার নতুন শুল্ক পরিকল্পনার কথা জানান। সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরা ৬-৩ ভোটে দেওয়া রায়ে বলেন, প্রেসিডেন্ট ১৯৭৭ সালের ইমারজেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইইপিএ) প্রয়োগ করতে গিয়ে তার ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন।

আদালতের এই সিদ্ধান্ত বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও যেসব মার্কিন রাজ্য ট্রাম্পের শুল্ক নীতিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল তাদের জন্য বড় জয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আইইইপিএ-র বদৌলতে কয়েক মাস যুক্তরাষ্ট্র যাদের কাছ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার শুল্ক আদায় করেছে, তা ফেরত দেওয়ার পথ খুলবে। একইসঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন অনিশ্চয়তাও শুরু হবে।

তবে আইনি লড়াই ছাড়া শুল্কের মাধ্যমে নেওয়া অর্থ ফেরত যাবে না বলে শুক্রবার হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন। আর এ আইনি লড়াই শেষ হতে কয়েক বছরও লাগতে পারে, বলেছেন তিনি। রিপাবলিকান এ প্রেসিডেন্ট আরও জানান, শুল্ক কার্যকরে তার হাতে আরও অনেক আইন আছে। যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে এই শুল্কের প্রয়োজন আছে বলেও যুক্তি দেন তিনি।

প্রধান বিচারপতি জন রবার্টসসহ সুপ্রিম কোর্টের যে ৬ বিচারক ট্রাম্পের শুল্কের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, তার মধ্যে তিন উদারপন্থির পাশাপাশি ট্রাম্পের হাতে নিয়োগ পাওয়া দুই বিচারক অ্যামি কনে ব্যারেট ও নেইল গোরসাচও আছেন। তবে তিন রক্ষণশীল বিচারক ক্লারেন্স থমাস, ব্রেট কাভানহ ও স্যামুয়েল আলিতো সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন।

হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প বলেন, রিপাবলিকানদের হাতে নিয়োগপ্রাপ্ত যে বিচারকরা তার শুল্কনীতির বিপক্ষে ভোট দিয়েছে তাদের নিয়ে তিনি ‘ভীষণ লজ্জিত’। ওই বিচারকরা ‘বোকা ও তোষামোদে লিপ্ত’ এবং তাদের ‘দেশপ্রেম একেবারেই নেই । তারা সংবিধানের প্রতিও অনুগত নয়’। সুপ্রিম কোর্টের ওই রায়ের পর ওয়াল স্ট্রিটে চাঙাভাব দেখা গেছে। অবশ্য শুক্রবারই ট্রাম্প ধারা ১২২ নামে পরিচিত, কখনো ব্যবহৃত না হওয়া একটি আইনের অধীনে নতুন ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন। ওই আইনে প্রেসিডেন্টকে দেড়শ দিনের জন্য সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যেই কংগ্রেসকে পদক্ষেপ নিতে হবে।
ট্রাম্পের এ আদেশে কিছু খনিজ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও সার, কমলা ও গরুর মাংসের মতো কিছু কৃষিজাত পণ্য, ওষুধ ও ইলেকট্রনিক্স এবং নির্দিষ্ট কিছু গাড়িসহ অনেক পণ্যে ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই ছাড়ের তালিকা খুবই সাধারণভাবে দেওয়া হয়েছে—ঠিক কোন কোন পণ্য এই ছাড় পাবে, তা স্পষ্ট করে বলা হয়নি।
উত্তর আমেরিকান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (ইউএসএমসিএ) অধীনে কানাডা ও মেক্সিকোর বেশিরভাগ পণ্যই ছাড়ের আওতাতেই থাকবে।

হোয়াইট হাউসের ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, আদালত ভুলবশত যেসব সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে, সেগুলোর জায়গায় এখন অন্যান্য বিকল্প ব্যবহার করা হবে। আমাদের কাছে বিকল্প আছে—দারুণ সব বিকল্প। এর মাধ্যমে হয়তো আরও বেশি অর্থ আয় হতে পারে। আমরা আরও বেশি অর্থ আদায় করব এবং আরও অনেক শক্তিশালী হব।

হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইতোমধ্যে বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করে ফেলা দেশগুলোর ওপরও এই নতুন ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপ হবে। এসব দেশ এখন নিজেদের চুক্তিতে নির্ধারিত শুল্ক হারের বদলে সেকশন ১২২-এর অধীনে বৈশ্বিক ১০ শতাংশ শুল্ক দেবে।

প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস তার রায়ে উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে কর ও শুল্ক নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে কংগ্রেসকে, প্রেসিডেন্টকে নয়। তিনি লিখেছেন, অস্বাভাবিক ক্ষমতার চর্চা হিসেবে শুল্ক আরোপের জন্য প্রেসিডেন্টকে অবশ্যই কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ‘স্পষ্ট অনুমোদনের’ প্রমাণ দিতে হবে। কিন্তু তিনি তা পারেননি। আদালতের মতে, আইইইপিএ আইনে ‘নিয়ন্ত্রণ’ এবং ‘আমদানি’ শব্দ দুটি থাকলেও, এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্টকে যেকোনো দেশের ওপর যেকোনো হারে অসীম সময়ের জন্য শুল্ক বসানোর ক্ষমতা দেওয়া হয়নি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, নিজের শুল্কনীতি এগিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি অন্য আইনের আশ্রয় নেবেন। তার মতে, এই শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করে। মূলত বিশ্বের প্রায় সব দেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর আরোপ করা আমদানি শুল্ক নিয়ে ছিল আদালতের এই লড়াই। শুরুতে এই শুল্ক মেক্সিকো, কানাডা ও চীনের ওপর আরোপ করা হয়। পরে গত এপ্রিলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এর পরিধি বাড়িয়ে আরও ডজনখানেক বাণিজ্য অংশীদারের ওপর তা প্রয়োগ করা হয়। হোয়াইট হাউস ১৯৭৭ সালের ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট-এর (আইইইপিএ) বরাত দিয়ে দাবি করেছিল, এই আইন প্রেসিডেন্টকে জরুরি অবস্থায় বাণিজ্য ‘নিয়ন্ত্রণের’ ক্ষমতা দেয়। কিন্তু এ পদক্ষেপের ফলে দেশে-বিদেশে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

গত বছর আদালতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে প্রতিবাদকারী অঙ্গরাজ্য ও ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনজীবীরা বলেন, ট্রাম্প শুল্কারোপের জন্য যে আইন ব্যবহার করেছেন, সেখানে ‘শুল্ক (ট্যারিফ)’ শব্দটির কোনো উল্লেখই নেই। তারা বলেন, কংগ্রেস তাদের কর আদায়ের ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চায়নি। এমনকি বিদ্যমান অন্যান্য বাণিজ্য চুক্তি ও শুল্ক বিধিগুলোকে ‘বাতিল করার জন্য প্রেসিডেন্টকে সীমাহীন ক্ষমতা’ দেওয়ার উদ্দেশ্যও কংগ্রেসের ছিল না। রক্ষণশীল হিসেবে পরিচিত প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস তার মতামতে এই যুক্তির পক্ষেই অবস্থান নেন।

ট্রাম্প বলেন, এ রায়ের কারণে ‘যেসব বিদেশি রাষ্ট্র বছরের পর বছর আমাদের ঠকিয়ে আসছিল, তারা এখন উচ্ছ্বসিত। তারা এতটাই খুশি যে রাস্তায় নেচে বেড়াচ্ছে। তবে তারা বেশিদিন এই নাচ নাচতে পারবে না, এটুকু আমি আপনাদের নিশ্চিত করতে পারি।’ সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ওয়াল স্ট্রিটের শেয়ারের দাম বেড়ে যায়। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক প্রায় ০.৭ শতাংশ বেড়ে দিনের লেনদেন শেষ করে।  তবে শুল্কের খরচ থেকে মুক্তি ও অর্থ ফেরতের যে আশা করা হচ্ছে, তা হয়তো শেষ পর্যন্ত অধরাই থেকে যেতে পারে।

Home R3