গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটকে আমরা নাগরিক অধিকার হিসেবে দেখি। কিন্তু ইসলামের সুমহান আদর্শে ‘ভোট’ কেবল একটি কাগজের টুকরো বা সমর্থন নয়; এটি একটি সাক্ষ্য (শাহাদাত) এবং একটি পবিত্র আমানত। আমরা কাকে নেতা হিসেবে নির্বাচন করছি, তার ওপর নির্ভর করে সমাজের ইনসাফ ও শৃঙ্খলা।
দুর্ভাগ্যবশত, বর্তমান সময়ে রাজনীতিতে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া যেন একটি প্রথা বা ‘রুটিন কাজে’ পরিণত হয়েছে। কিন্তু একজন মুসলিমের কাছে এর পরিণতি দুনিয়া ও আখেরাতে অত্যন্ত ভয়াবহ।
ইসলামে আমানত রক্ষা এবং প্রতিশ্রুতি পূরণ করা ঐচ্ছিক কোনো বিষয় নয়, বরং এটি বাধ্যতামূলক। মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘আর তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ করো; নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত: ৩৪)
রাজনীতিকরা যখন ভোটের মাঠে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেন, তখন তারা মূলত জনগণের সাথে একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হন। যদি সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষার সামর্থ্য বা সদিচ্ছা তাদের না থাকে, তবে সেটি স্পষ্ট প্রতারণা।
অনেকেই মনে করেন, ভোট পাওয়ার জন্য তো এক-আধটু মিথ্যা বলতেই হয়। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস এই ধারণাকে কোনোভাবে সমর্থন করে না; বরং কঠোরভাবে খণ্ডন করে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি: ১. কথা বললে মিথ্যা বলে। ২. প্রতিশ্রুতি দিলে তা ভঙ্গ করে। ৩. আমানত রাখা হলে তাতে খেয়ানত করে ‘ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪)
জনগণের পবিত্র বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া এবং পরবর্তীতে তা ভঙ্গ করা একজন ঈমানদারের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। এটি চরম আত্মিক দেউলিয়াত্ব ও ঈমানি দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ। একজন প্রকৃত মুমিন কখনোই দুনিয়াবি ক্ষমতার মোহে পড়ে নিজের পরকাল বিকিয়ে দিতে পারে না। কারণ, তিনি জানেন, জনগণের সাথে করা প্রতিটি প্রতারণা ও আমানতের খেয়ানতের জন্য হাশরের ময়দানে মহান আল্লাহর দরবারে তাকে কঠোর জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।
আমাদের সমাজে নেতৃত্বের লোভ অনেকের মধ্যেই তীব্র। অথচ ইসলাম নেতৃত্বকে একটি কঠিন দায়বদ্ধতা হিসেবে দেখে। এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘তোমরা অতি সত্বর নেতৃত্বের লোভ করবে। (স্মরণ রেখো) এটি কেয়ামতের দিন অনুতাপের কারণ হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭১৪৮)
তাই মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ক্ষমতা দখল করলে দুনিয়াতে হয়তো সাময়িক প্রতিপত্তি পাওয়া যায়, কিন্তু আখেরাতে আল্লাহর দরবারে প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব দিতে হবে।
যখন কোনো নেতা জেনেশুনে মিথ্যা আশ্বাস দেন, তখন তার ক্ষতি আর ব্যক্তিগত থাকে না; তা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। যেমন: জনগণের মধ্যে নেতৃত্বের প্রতি ঘৃণা ও অবিশ্বাস তৈরি হয়। রাজনীতিতে মিথ্যা বলাটাই যখন স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন সৎ মানুষ রাজনীতি থেকে দূরে সরে যায়। মিথ্যা দিয়ে শুরু হওয়া নেতৃত্ব কখনোই ন্যায়বিচার বা ইনসাফ কায়েম করতে পারে না।
ভোট যেহেতু একটি সাক্ষ্য, তাই যোগ্য ব্যক্তিকে ভোট না দেওয়া বা অযোগ্য ব্যক্তিকে জেনে-বুঝে ভোট দেওয়া মিথ্যে সাক্ষ্য দেওয়ার শামিল। রাজনৈতিক দলগুলোকে যেমন সতর্ক থাকতে হবে, তেমনি ভোটারদেরও মনে রাখতে হবে—আপনার একটি ভোট যেন কোনো খেয়ানতকারীকে শক্তিশালী না করে।
একজন মুসলিম রাজনীতিকের আদর্শ হওয়া উচিত সত্যবাদিতা ও স্বচ্ছতা। কম কথা বলে কাজ বেশি করা এবং যা করা সম্ভব কেবল তারই প্রতিশ্রুতি দেওয়া ইসলামের শিক্ষা। মনে রাখতে হবে, আল্লাহ সত্যবাদীদের সাথে থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। রাজনীতি যদি সমাজসেবার মাধ্যম হয়, তবে তার ভিত্তি হতে হবে সত্যের ওপর।
আল্লাহ আমাদের দেশের নেতা এবং জনগণকে আমানত রক্ষায় সচেতন হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।