জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান গতকাল সোমবার কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহে নির্বাচনী জনসভা করেছেন। এসব সভায় তিনি আগামী ১২ ফেব্রুয়ারিকে ‘ব্যালট বিপ্লব’ হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি বলেছেন, ‘উন্নয়নের নামে ৫৪ বছর কমবেশি যারাই ক্ষমতায় গিয়েছে, সবাই একই কাজ করেছে। একেবারে তছনছ করে দিয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, এদের দৃষ্টিভঙ্গি ও চরিত্রের পরিবর্তন না করলে ভালো কিছু সম্ভব নয়।’
নারীদের অবর্ণনীয় ত্যাগের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘মায়েদের ঋণ শোধ করার ক্ষমতা আমাদের নেই। সেই মায়ের দিকে যারা খারাপ দৃষ্টিতে তাকাবে, তাদের চোখ উপড়ে ফেলা হবে।’
জামায়াত জোটের নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে বাড়ি বাড়ি যাওয়া নারীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করার অভিযোগ তুলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের উদ্দেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘নতুন করে সুরসুরি দিও না, আমাদের পরীক্ষা করার কিছু নেই। ধৈর্যের পরীক্ষা নিও না। বেয়াদবি করলে আগুনের ফুলকি দেখানো হবে।’
গতকাল দক্ষিণাঞ্চলের প্রচারণা শুরু হয় কুষ্টিয়ায় জনসভার মধ্য দিয়ে। চাঁদাবাজির ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘চালের ট্রাকপ্রতি পাঁচ হাজার টাকা নেওয়ার খবর আমরা জানি।’ পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট নির্মূলের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা চাঁদাবাজদের বুক থেকে দূরে ঠেলে দেব না, বরং তাদের বুকে টেনে নিয়ে ভালো কোনো কাজে যুক্ত করব।’ ১১ দলীয় ঐক্যজোটের সরকার কুষ্টিয়া চিনিকল ফের চালু করবে বলে জানান তিনি।
কর্মজীবী নারীদের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের এত তালা কেনার টাকা নেই যে নারীদের ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখব। আমরা নারীদের জন্য নিরাপদ সমাজ ও কর্মস্থল নিশ্চিত করব। বড় শহরগুলোতে আলাদা বাস চালু করব।
জামায়াত ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্রপতি থেকে ভিখারি পর্যন্ত সবার জন্য একই বিচার নিশ্চিত করা হবে বলেও ঘোষণা দেন তিনি। নদী রক্ষার প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত আমির বলেন, পদ্মা-গড়াই এখন আর নদী নয়, মরুভূমি। এই নদী বাঁচানোর টাকা মুখ দিয়ে ঢুকিয়ে পেটে পাঠানো হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা শহরের টাউন ফুটবল মাঠে বিকেল ৫টায় জনসভায় ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আগামী নির্বাচনে ১১ দলের ২২টি হাত একত্র হয়েছি। অর্থাৎ বাংলাদেশের আপামর জনগণ একত্র হয়েছে। এই বাংলাদেশ দুর্নীতিবাজ, দখলবাজ, চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ ও ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে চিরতরে লাল কার্ড দেখাবে। গণভোটে হ্যাঁ ভোট জিতলে বাংলাদেশ জিতে যাবে, না ভোট জিতলে বাংলাদেশ হেরে যাবে।
তিনি বলেন, আমাদের যেসব জনপ্রতিনিধি জয়ী হবেন, তারা কখনও সম্পদের পাহাড় বানাবেন না। তাদের সম্পদ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে না। প্রতিবছরে তাদের এবং স্বজনদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করতে বাধ্য থাকবে।
ঝিনাইদহ শহরের ওয়াজির আলী হাইস্কুল মাঠে সন্ধ্যায় জনসভায় শফিকুর রহমান বলেন, মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রতিটি জেলায় মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা হবে। বেকার সমস্যার সমাধান করতে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। চাঁদাবাজি, দুর্নীতি বন্ধ করা হবে। চাঁদাবাজির চেয়ে ভিক্ষা করা সম্মানের।
২৩ মিনিটের বক্তব্যে আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে তার একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা তুলে ধরেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, ‘প্রিয় ঝিনাইদহবাসী, পাশের জেলা যশোরে যান, সেখানে মেডিকেল কলেজ আছে। কিন্তু রাস্তার বেহাল দশা। সরকারের কি জনশক্তি নাই? তাহলে অবকাঠামো কেন উন্নয়ন হচ্ছে না? রাষ্ট্রের সম্পদ লুটপাট করা হয়েছে। আমরা কথা দিচ্ছি, জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে লুটপাটকারীদের পেটে হাত দিয়ে সব সম্পদ বের করে আনা হবে, সেটা দেশে অথবা বিদেশে।’
মেহেরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে দুপুরে নির্বাচনী জনসভায় ডা. শফিকুর রহমান ‘আল্লাহর কসম’ করে বলেছেন, ১১ দলীয় জোট ক্ষমতায় গেলে জনগণের সম্পদের ওপরে হাত দেব না। ন্যায্যতার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করব। এ সময় দেশ পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্তদের সম্পদ বাড়বে না। সম্পদ বাড়বে জনগণের। পাঁচ বছর পর নয়, প্রতিবছর দেশের সব মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে চেয়ারম্যান-মেম্বার পর্যন্ত জনগণের কাছে হিসাব দিতে বাধ্য থাকবে। নিজেরা দুর্নীতি করব না, কাউকে করতেও দেব না।
তিনি আরও বলেন, আপনারা দেখেছেন ৫৪ বছর ধরে যারা ক্ষমতায় ছিল, তাদের দুর্নীতি ও দুঃশাসন। ক্ষমতাবানরা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না, তারা দুর্নীতি করেনি, ব্যাংক লুট করেনি।