১৯ জানুয়ারি, ২০২৬

ট্রাম্পের কঠোর সমালোচনায় জাতিসংঘ মহাসচিব

ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া নেতৃত্ব পরিবর্তন, ইরানে বিক্ষোভ পরিপ্রেক্ষিতে হস্তক্ষেপের হুমকি এবং গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য হুমকি বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস অভিযোগ করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইনকে তোয়াক্কা না করে ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছে।  বহুপাক্ষিক সমাধানে না গিয়ে ওয়াশিংটনের নিজেদের শক্তি ও প্রভাবকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি রেডিও ফোরের ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গুতেরেস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি ‘স্পষ্ট বিশ্বাস’ কাজ করছে যে, বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এখন আর কার্যকর নয়।  তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের কাছে ক্ষমতা ও প্রভাবের প্রয়োগ মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে , যা অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ডকে উপেক্ষা করছে।

গুতেরেসের এ মন্তব্য এমন এক সময়ে আসে, যখন কয়েক সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্টকে আটক করে।  একই সঙ্গে ট্রাম্প বারবার গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দিয়ে আসছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার মূল নীতিগুলো, বিশেষ করে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সমান অধিকারের বিষয় এখন গুরুতর হুমকির মুখে পড়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগেও জাতিসংঘের তীব্র সমালোচনা করেছেন।  গত সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প সংস্থাটির অস্তিত্বের প্রয়োজনীয়তাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেন।  তিনি দাবি করেন, শেষ না হওয়া সাতটি যুদ্ধ তিনি শেষ করেছেন, অথচ জাতিসংঘ সেগুলোর কোনোটিতেই সহায়তা করেনি।  ট্রাম্প বলেন, পরে আমি বুঝেছি, জাতিসংঘ আমাদের জন্য ছিল না।

কঠোর সমালোচনার জবাবে গুতেরেস স্বীকার করেন, জাতিসংঘের জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে সনদের আলোকে আন্তর্জাতিক আইন মানতে বাধ্য করানো দিন দিন কঠিন হয়ে পরছে।

তিনি বলেন, বড় বৈশ্বিক সংঘাত সমাধানে জাতিসংঘ সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকলেও বাস্তব ক্ষমতা মূলত বড় শক্তিগুলোর হাতেই।

তার প্রশ্ন, এই অতিরিক্ত ক্ষমতা কি দীর্ঘস্থায়ী ও বাস্তবসম্মত সমাধানের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে, নাকি কেবল সাময়িক ও তড়িঘড়ি সমাধানের জন্য? উত্তরে তিনি বলেন,  এই দুইয়ের মধ্যে আকাশ–পাতাল পার্থক্য রয়েছে।

গুতেরেস আরও বলেন, জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্র যে ভয়াবহ সমস্যা ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তা মোকাবিলায় সংস্থাটির কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।

তিনি সতর্ক করে বলেন, অনেকে মনে করেন আইনের শাসনের জায়গায় ক্ষমতার শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত।  যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নীতিতে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে যে, বহুপাক্ষিক সমাধান অপ্রাসঙ্গিক এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ও প্রভাবের প্রয়োগ।  সেক্ষেত্রে যদি তা আন্তর্জাতিক আইনের সীমারেখাও অতিক্রম করে।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ নিয়েও কড়া সমালোচনা করেন গুতেরেস।  তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য গঠিত এই পরিষদ আর বর্তমান বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব করে না এবং কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।  বর্তমানে পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন—যে কেউ ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে।  এই ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধ বন্ধে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ বারবার বাধা দিয়েছে।

গুতেরেস বলেন, ভেটো ক্ষমতা এখন অনেক সময় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হয়ে উঠছে।  বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এমন তিনটি ইউরোপীয় দেশ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে  রয়েছে।

তিনি পরিষদের গঠন পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, বৈধতা ফিরিয়ে আনতে এবং পুরো বিশ্বের কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে এই সংস্কার জরুরি।

তিনি নিরাপত্তা পরিষদের গঠন পরিবর্তনের আহ্বান জানান।  অগ্রহণযোগ্য অচলাবস্থা এড়াতে ভেটো ক্ষমতা সীমিত করারও প্রস্তাব দেন তিনি।

পর্তুগালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গুতেরেস ২০১৭ সালে জাতিসংঘ মহাসচিবের দায়িত্ব নেন।  চলতি বছরের শেষেই তার মেয়াদ শেষ হচ্ছে।  সাধারণ পরিষদে তার বার্ষিক ভাষণে তিনি বিশ্ব পরিস্থিতিকে সংঘাত, দায়মুক্তি, বৈষম্য ও অনিশ্চয়তায় ভরপুর বিশৃঙ্খল এক বিশ্ব হিসেবে বর্ণনা করেন।  তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইন প্রকাশ্যে লঙ্ঘনই বৈশ্বিক ব্যবস্থার জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

গুতেরেস গাজা সংকটকে জাতিসংঘের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চলমান সংঘাত হিসেবে উল্লেখ করেন।  তিনি বলেন, যুদ্ধের বড়  সময় আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোকে গাজায় সহায়তা প্রবেশে ইসরাইল  বাধা দেওয়ায় জাতিসংঘ সেখানে ত্রাণ বিতরণ করতে পারেনি।  এক পর্যায়ে ইসরায়েল জাতিসংঘের পরিবর্তে গাজা হিউম্যানিটারিয়ান অর্গানাইজেশন নামে একটি বাহ্যিক ঠিকাদার সংস্থাকে ত্রাণ কার্যক্রমের দায়িত্ব দেয়।  এসব স্থানে খাদ্য সংগ্রহের চেষ্টা করতে গিয়ে শত শত ফিলিস্তিনি নিহত হন।

গাজায় জাতিসংঘ কি ক্ষমতাহীন ছিল? এমন প্রশ্নের জবাবে গুতেরেস বলেন, অবশ্যই, কিন্তু বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া দরকার।  দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল বলেছে, জাতিসংঘ ত্রাণ বিতরণে সক্ষম নয়।  বাস্তবে যখনই আমাদের গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি, তখন আমরা সেখানে যেতে পারিনি। পরে যুদ্ধবিরতি হলে বিপুল পরিমাণ মানবিক সহায়তা প্রবাহিত হয়।  উপযুক্ত পরিবেশ পেলে আমরা প্রস্তুতই ছিলাম বলেও জানান তিনি।

কয়েক দিন আগে সাধারণ পরিষদে জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাকালীন কাঠামোর দিকে ইঙ্গিত করে গুতেরেস মন্তব্য করেন, ১৯৪৫ সালের সমস্যা সমাধানের পদ্ধতি দিয়ে ২০২৬ সালের সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

বহুপাক্ষিকতার মৃত্যু এবং আন্তর্জাতিক আইনের শাসন রক্ষায় অনেক বিশ্বনেতার নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।  তবে এত কিছুর মধ্যেও গুতেরেস আশাবাদী থাকার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, অনেকেই শক্তিশালীদের মুখোমুখি হতে দ্বিধা বোধ করেন।  কিন্তু সত্য হলো, যদি আমরা শক্তিশালীদের চ্যালেঞ্জ না করি, তবে কখনোই একটি ভালো পৃথিবী গড়ে তুলতে পারব না।