রাসুল সা. ছিলেন আল্লাহর ভয়ে বিনম্র ক্রন্দনরত আত্মার মূর্তপ্রতীক। তিনি মানুষের ব্যর্থতা এবং খারাপ কাজে ফিরে যাওয়া দেখে কাঁদতেন। এছাড়া মানুষ যখন আল্লাহকে স্মরণ করে এবং গুনাহের ভয়ে কান্না করত, তখন তিনি সেই বান্দার প্রশংসা করতেন। কেননা এভাবে সে অন্তরকে শক্তিশালী, আত্মাকে বিশেষায়িত ও হৃদয়কে পবিত্র করতে পারে।
রাসুল সা. হলেন জগতের আল্লাহকে ভয়কারীদের নেতা, বিচার দিবসে প্রভুর ভয়ে ভীতসন্ত্রস্তদের ইমাম, চোখের পাতা সিক্তকারী, দ্রুত অশ্রু নিবারণকারী, অন্তর হালকাকারী, কোমলতায় আলোড়ন সৃষ্টিকারী, সত্য ও পবিত্রতার জন্য অশ্রুবিসর্জনকারী, বিনম্রচিত্তে কুনুত পড়ার সময় ফুঁপিয়ে ক্রন্দনকারী।
মানুষের চোখের পানির মর্যাদা আল্লাহ তাআলার নিকট অনেক বেশি। তাই মানুষের উচিত তাঁর ভয়ে বেশি বেশি কান্নাকাটি করা। আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতে মানুষকে তাঁর সব বিধিবিধান মেনে চলার পাশাপাশি তাঁর ভয়ে বেশি বেশি কান্নাকাটির করার তাওফিক দান করুন। মানুষের মনে তাঁর ভয় ও মহব্বত সৃষ্টি করে দিন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আকাশ ও পৃথিবী কেউ তাদের জন্য কান্না করেনি এবং তাদেরও অবকাশ দেওয়া হয়নি।’ (সুরা দুখান : ২৯)
এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয়, অবিশ্বাসী ও পাপিষ্ঠদের মৃত্যুতে আসমান-জমিন খুশি হয়। আর মুমিনদের মৃত্যুতে কাঁদে। নবিজি সা. বলেন, প্রবাসে মৃত্যুর কারণে যে মুমিন ব্যক্তির জন্য কোনো ক্রন্দনকারী থাকে না, তাঁর জন্য আসমান ও জমিন কান্না করে।
নবিজি সা.-এর জীবন-যাপন অন্য দশজন মানুষের মতোই ছিল। অন্যদের মতোই তিনি চলতেন, ফিরতেন, খেতেন, ঘুমাতেন। তবে তাঁর চলা, বলা ও কাজকর্মের ধরন ছিল আলাদা। প্রতিটি ইবাদতই করতেন একাগ্রচিত্তে; প্রভুর স্মরণ রেখে। ফলে কান্নামিশ্রিত ইবাদতের প্রকাশ পেত তাঁর থেকে। নামাজ আদায়, কুরআন তিলাওয়াত বা অন্য কোনো ইবাদতে নবিজি খুব কাঁদতেন। চোখ থেকে ঝরঝর করে অশ্রু প্রবাহিত হতো।
নবিজির কান্নার ধরন প্রসঙ্গে আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রাহ. বলেন, রাসুল সা.-এর কান্না ছিল তাঁর হাসির মতোই নীরব। তিনি শব্দ করে কাঁদতেন না, যেমন স্বশব্দে হাসতেন না। কেবল তাঁর দুই চোখ অশ্রু ঝরাত। (জাদুল মাআদ : ১৮৩)
এ ছাড়া যখন আবু তালিব কাফিরদের পীড়াপীড়িতে নবিজিকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া থেকে বিরত থাকতে বললেন, তখনো তিনি চাচা আবু তালিবের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে কেঁদে ফেলেছিলেন। (জাদুল মাআদ : ১/১৮৩; সহিহ বুখারি : ৪৬৮২; সহিহ মুসলিম : ৯২৩)
কুরআন-সুন্নাহে মৃত্যুপরবর্তী সময়ে কথা এসেছে। মৃত্যুর পরই কবরে পাপীদের শাস্তি ও নেককার বান্দাদের শান্তি শুরু হয়ে যাবে। পাপেীদের কবরের আজাব বা শাস্তি হবে ভয়াবহ। তাই ইসলাম আমাদের কবর আজাব ও তার ভয়াবহতা থেকে আশ্রয় চাওয়ার জন্য বলেছেন। নবিজি সা. সব সময় কবরের আজাব ও তার ভয়াবহতার জন্য কান্না করতেন।
মহান আল্লাহর ভয় ও পরকালের চিন্তায় কান্না করেছেন নবিজি সা.। উম্মতের জন্যও কেঁদেছেন তিনি। অসংখ্য হাদিসে রাসুলের কান্নার ঘটনা চিত্রিত হয়েছে। নবিজি সা. কাফিরদের হিদায়াতের জন্য যেমন কেঁদেছেন, তেমনই উম্মতের জন্য জার জার করে কেঁদেছেন। নিম্নে নবিজির সন্তান, পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনের মৃত্যুতে নবিজির কান্নার কিছু উদাহরণ তুলে ধরা হলো।
প্রিয়জনের জন্য নবিজির কান্না
আয়েশা রা. বলেন, উসমান ইবনু মাজউন রা.-এর মৃত্যুর পর নবিজি সা. তাঁর ললাটে চুম্বন করেন। এ সময় নবিজির চোখ থেকে অশ্রু ঝরছিল। (শামায়েলে তিরমিজি : ৩১১/৫)
আনাস রা. থেকে বর্ণিত; উম্মু কুলসুম রা.-এর ইনতিকালের পর নবিজি সা. তাঁর কবরের পাশে বসে ছিলেন, তখন তাঁর চোখ থেকে অশ্রু ঝরছিল। (শামায়েলে তিরমিজি : ৩১২/৬)
পরিবারের মৃত্যুতে কান্না
উসামা ইবনু জায়েদ রা. বলেন, নবিজির মেয়ে তাঁর কাছে সংবাদ পাঠিয়েছেন, তাঁর সন্তান মৃতপ্রায়। তিনি কয়েকজন সাহাবি নিয়ে সেখানে গেলেন। শিশুটিকে নবিজির কোলে তুলে দেওয়া হলো। তখনো শিশুটির প্রাণের স্পন্দন পাওয়া যাচ্ছে। বর্ণনাকারী বলেন, আমি ধারণা করলাম, তিনি বলেছিলেন, মনে হয়, যেন একটি চামড়ার পাত্র। তাঁরপর তাঁর দুচোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল। সাআদ রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, এটা কী? নবিজি সা. বললেন, এটাই মমতা, যা আল্লাহ তাঁর বান্দাদের অন্তরে রেখেছেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর দয়ালু বান্দাদেরই দয়া করেন। (সহিহ মুসলিম : ৯২৩)
উচ্চ আওয়াজে কাঁদতে নিষেধ
ইবনু আব্বাস রা. বর্ণনা করেন; নবিজি সা.-এর কোনো এক কন্যা মুমূর্ষু অবস্থায় উপনীত হলে তিনি তাঁকে স্বীয় কোলে উঠিয়ে নেন। তখন নবিজির সামনেই তাঁর মৃত্যু হয়। নবিজির দাসী উম্মু আইমান রা. তখন উচ্চৈঃস্বরে কাঁদতে থাকেন।
নবিজি সা. তাঁকে বললেন, তুমি আল্লাহর নবিজির সামনে এভাবে উচ্চৈঃস্বরে কাঁদছ! উম্মু আইমান বললেন, ‘আল্লাহর রাসুল, আপানাকেও তো কাঁদতে দেখছি।’ নবিজি সা. বললেন, ‘এটা ওই নিষিদ্ধ কান্না নয়; ওটা আল্লাহর রহমত।’ (শামায়েলে তিরমিজি : ৩১০/৫)
চাচা আবু তালিবের ইনতিকালে নবিজির কান্না
আবু তালিব ঘাঁটিতে কয়েক বছরের অবরুদ্ধ জীবন থেকে মুক্ত হওয়ার ছয় মাস পর নবুয়তের দশম বর্ষে রজব মাসে রাসুলুল্লাহ সা.-এর চাচা আবু তালিব ইনতিকাল করেন।
অন্য বর্ণনায় এ কথা উল্লেখ রয়েছে যে খাদিজা রা.-এর ইনতিকালের তিন দিন আগে রমজান মাসে তিনি ইনতিকাল করেন।
আবু তালিবের ইনতিকালের সময় ঘনিয়ে এলে রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর কাছে যান। সেখানে আবু জাহলও উপস্থিত ছিল। রাসুলুল্লাহ সা. বলেন, চাচাজান আপনি শুধু লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলুন—এই স্বীকারোক্তি করলেই আমি আল্লাহর কাছে আপনার জন্য সুপারিশ করতে পারব। আবু জাহল ও আবদুল্লাহ ইবনু উমাইয়া বলল, আবু তালিব, আপনি কি আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন?
এরপর তারা দুজন আবু তালিবের সঙ্গে কথা বলতে লাগল। আবু তালিব শেষ কথা বলেছিলেন যে আবদুল মুত্তালিবের ধর্মের ওপর…। নবিজি সা. বলেন, আমাকে নিষেধ না করা পর্যন্ত আমি আপনার জন্য মাগফিরাতের দুআ করতে থাকব। এরপর মহান আল্লাহ এই আয়াত নাজিল করেন আত্মীয়-স্বজন হলেও মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা নবি ও মুমিনদের জন্য সংগত নয়, যখন এটা সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে ওরা জাহান্নামি।
এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা নিম্নোক্ত আয়াতও নাজিল করেন, তুমি যাকে ভালোবাসো ইচ্ছা করলেই তাকে সৎপথে আনতে পারবে না, তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনয়ন করেন এবং তিনিই ভালো জানেন সৎপথ অনুসারীদের।
খাদিজার ইনতিকালে নবিজির কান্না
আবু তালিবের ইনতিকালের দুই মাস, অন্য বর্ণনা মতে, তিন দিন পর উম্মুল মুমিমিন খাদিজা রা. ইনতিকাল করেন, নবুওয়াতের দশম বছরের রমজান মাসে তাঁর ইনতিকাল হয়েছিল। সেই সময় তাঁর বয়স ছিল ৬৫ বছর। রাসুলুল্লাহ সা.-এর বয়স ছিল ৫০।
খাদিজা রা. সিকি শতাব্দী যাবৎ রাসুল সা.-এর জীবনসঙ্গী ছিলেন। এ সময় দুঃখ-কষ্ট ও বিপদের সময় প্রিয় স্বামীর জন্য তাঁর প্রাণ কেঁদে উঠত। বিপদের সময় তিনি তাঁকে ভরসা দিতেন, ইসলাম প্রচারে নিত্যসঙ্গী থাকতেন, নিজের জীবন ও সম্পদ দিয়ে তাঁর দুঃখ-কষ্ট দূর করতেন। (ইবনে হিশাম : ১/৪১৬)