৫ জানুয়ারি, ২০২৬

আবদুল্লাহ জুল-বিজাদাইন (রা.) : শাহাদতের তামান্নায় ব্যাকুল সাহাবি

মৃত্যু অমোঘ কিন্তু সেই মৃত্যুই যখন কারও ললাটে সৌভাগ্যের তিলক এঁকে দেয়, তখন তা হয়ে ওঠে জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন। ত্যাগের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ এমন কিছু ক্ষণজন্মা মানুষের জীবনে পরম পাওয়া হয়ে আসে শাহাদত; তা-ও আবার স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র হাতে। এর চেয়ে পরম তৃপ্তি ও মহিমান্বিত মৃত্যু আর কী হতে পারে?

ইসলামের ইতিহাসে এমনই এক প্রোজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন বিখ্যাত তরুণ সাহাবি আবদুল্লাহ জুল-বিজাদাইন ইবনে আবদুল উজ্জা আল-মুজানি (রা.)। তাঁর বংশপরম্পরা হলো: আবদুল্লাহ ইবনে আবদে নুহম ইবনে আফিফ ইবনে সুহাইম ইবনে আদি ইবনে সালাবা ইবনে সাদ ইবনে আদি ইবনে উসমান ইবনে আমর। মুজায়না গোত্রের সন্তান। তিনি প্রসিদ্ধ সাহাবি আবদুল্লাহ বিন মুগাফফাল (রা.)-এর চাচা।

তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহচর্য গ্রহণ করেন এবং তাঁর সাথেই অবস্থান করতেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের অধিকারী (আওয়াহ), অত্যন্ত মর্যাদাবান এবং পবিত্র কুরআনের একনিষ্ঠ তিলাওয়াতকারী।

আবদুল্লাহ ছিলেন শৈশবে পিতৃহারা এক এতিম যুবক। পিতার কাছ থেকে কোনো সম্পদ পাননি। তাঁর চাচা ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী ও ধনাঢ্য ব্যক্তি; তিনি আবদুল্লাহর দায়িত্ব নেন এবং তার তত্ত্বাবধানেই আবদুল্লাহ বড় হন। যৌবনে উপনীত হলে চাচা তাঁকে অনেক উট, ভেড়া ও দাসদাসী প্রদান করেন।

পার্থিব জীবনের সব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য যখন তাঁর হাতের মুঠোয়, ঠিক তখনই মদিনা থেকে উচ্চারিত তাওহিদের বাণী তাঁর হৃদয়ের গভীরে আলোড়ন তোলে। রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় এলে আবদুল্লাহর মন ইসলামের জন্য উন্মুখ হয়ে ওঠে। কিন্তু চাচার ভয়ে তিনি তা প্রকাশ করতে পারছিলেন না। কেননা, তাঁর চাচা ছিলেন চরম ইসলামবিদ্বেষী। যদিও তিনি মনেপ্রাণে চাইতেন চাচা ইসলাম গ্রহণ করুক, যিনি তাঁকে লালন-পালন করেছেন এবং অনেক নেয়ামত দিয়েছেন।

মুহাম্মদ বিন কা’ব আল-কুরাজি বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ জুল-বিজাদাইনের হৃদয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং ঈমানের প্রতি গভীর ভালোবাসা জন্মেছিল। মদিনাগামী হিজরতকারী সাহাবিদের তিনি অভ্যর্থনা জানাতেন এবং তাঁদের কাছ থেকে কুরআন শিখতেন। জ্ঞান অর্জনের নেশায় তিনি তাঁদের সাথে মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে চলতেন; এরপর পরবর্তী কাফেলার জন্য অপেক্ষা করতেন। এ সময় তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেও তা গোপন রেখেছিলেন।

এভাবে অনেকগুলো বছর পেরিয়ে যায়। অনেক ঐতিহাসিক যুদ্ধও সংঘটিত হয়। অবশেষে একদিন সাহস করে চাচাকে বললেন, ‘চাচা! আমি এতদিন আপনার ইসলাম গ্রহণের অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু আমি দেখছি আপনি মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শ গ্রহণের কোনো ইচ্ছাই করছেন না। এখন আমাকে অন্তত ইসলাম গ্রহণের অনুমতি দিন।’

স্বভাবতই চাচার ক্রোধ ছিল তীব্র। তিনি গর্জন করে বললেন, ‘তুমি যদি শেষ পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করার স্পর্ধাই দেখাও, তবে আমার দেওয়া যা কিছু তোমার কাছে আছে—এমনকি তোমার পরনের এই কাপড়টুকুও আমি কেড়ে নেব।’

কিন্তু সত্য দ্বীনের কাছে পার্থিব ধন-সম্পদ ছিল মূল্যহীন। আবদুল উজ্জা দৃঢ়চিত্তে জবাব দিলেন, ‘চাচা, আমি অবশ্যই মুসলমান হতে চাই, আমি মুহাম্মদের অনুকরণ অবশ্যই করব। এই নিন আপনার দেওয়া যা কিছু আমার কাছে আছে, সব নিয়ে নিন।’

নিষ্ঠুর চাচা সত্যিই তার দেওয়া সবকিছু কেড়ে নিলেন, এমনকি তাঁর পরনের কাপড়টিও টেনে নিয়ে তাঁকে রিক্ত করে দিলেন। আবদুল্লাহ সেই অবস্থায় তাঁর মায়ের কাছে গেলে মা নিজের একটি মোটা চাদর দুই টুকরো করে দিলেন। তিনি এক টুকরো ইজার (লুঙ্গি) হিসেবে এবং অন্য টুকরো রিদা (চাদর) হিসেবে গায়ে জড়িয়ে মদিনার পথে পা বাড়ালেন।

তিনি যখন মদিনায় পৌঁছালেন, তখন সাহরি বা শেষ রাতের সময়। তিনি ক্লান্ত শরীরে মসজিদে নববিতে শুয়ে থাকলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) ফজরের নামাজ শেষ করে নিয়ম অনুযায়ী উপস্থিত সবার দিকে দৃষ্টি দিচ্ছিলেন। অপরিচিত পোশাকে তাঁকে দেখে রাসুল (সা.) চিনতে পারেননি। ফলে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কে?’ তিনি নিজের পরিচয় দিলেন। এরপর নিজের ওপর ঘটে যাওয়া সবকিছু খুলে বললেন।

তাঁর এই আত্মত্যাগের কাহিনি শুনে রাসুল (সা.) দুঃখে বিগলিত হলেন। তিনি তখন তাঁর নাম পরিবর্তন করে রাখলেন আবদুল্লাহ। আর তাঁর এই ত্যাগের স্মারকস্বরূপ উপাধি  দিলেন ‘জুল-বিজাদাইন’, যার অর্থ ‘দুই টুকরো কম্বলওয়ালা’। এরপর রাসুল (সা.) বললেন, ‘আবদুল্লাহ, আজ থেকে তুমি আমার কাছাকাছিই থাকো।’ এরপর থেকে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মেহমানদের অন্তর্ভুক্ত হন এবং রাসুলের কাছ থেকে কুরআন শিখতে থাকেন।

মসজিদে নববিতে আশ্রয়লাভের পর আবদুল্লাহ (রা.) রাত-দিন আল্লাহর কিতাব শ্রবণে ও তিলাওয়াতে মগ্ন থাকতেন। কুরআনের তাঁর আগ্রহ এত তীব্র ছিল যে, তিনি উচ্চৈঃস্বরে তিলাওয়াত করতেন। সবসময় জিকির-তাসবিহ পাঠে মগ্ন থাকতেন।

উচ্চৈঃস্বরে তিলাওয়াতের কারণে একবার উমর (রা.) বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! সে কি লোকদেখানো কাজ করছে না?’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘উমর, তাঁকে কিছু বলো না। সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের জন্য সব কিছু ত্যাগ করে এসেছে।’ (আল-আওসাত, তাবারানি, হাদিস: ৯১১১; মুসনাদে বাজ্জার, হাদিস: ১৭০৬; মাজমাউজ জাওয়ায়েদ, হাইসামি, হাদিস: ৪২৩৭)

উকবা বিন আমির (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) জুল-বিজাদাইন সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘নিশ্চয়ই সে একজন “আওয়াহ” (অত্যন্ত বিনয়ী ও আল্লাহর কাছে ক্রন্দনকারী)।’

কারণ তিনি কুরআন তিলাওয়াত ও দুআর মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে আল্লাহর জিকির করতেন এবং তিলাওয়াতের সময় কণ্ঠস্বর উচ্চ করতেন। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১৭৪৪৭; আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি : খণ্ড-১৭, পৃ.-৩৩০; মাজমাউজ জাওয়ায়েদ, হাইসামি : খণ্ড-৯, পৃ.-৪১২; জাদুল মাআদ, ইবনুল কায়্যিম: খণ্ড-৩, পৃ.-৪৭১)

নবম হিজরিতে যখন তাবুক অভিযানের ডাক এল, সেটি ছিল মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা। একদিকে গ্রীষ্মের খরতপ্ত দাবদাহে মরুভূমি পুড়ছিল, অন্যদিকে ছিল পাথেয় আর বাহনের চরম সংকট। কিন্তু সব বাধা তুচ্ছ করে আল্লাহর রাসুল (সা.) প্রায় ৩০ হাজার সাহাবির এক বিশাল কাফেলা নিয়ে রোম সম্রাটের দর্প চূর্ণ করতে রওনা হলেন।

এই কঠিন যাত্রায় আবদুল্লাহ জুল বিজাদাইন (রা.)-এর অন্তরে যেন শাহাদতের তামান্না উথলে উঠল। তিনি ব্যাকুল হয়ে রাসুল (সা.)-এর দরবারে হাজির হয়ে আকুতি জানালেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আপনি আল্লাহর কাছে দুআ করুন, যেন আমি শাহাদতের অমীয় সুধা পান করতে পারি।’

রাসুল (সা.) বললেন, ‘আমাকে একটি গাছের ছাল এনে দাও।’ তিনি তা এনে দিলে রাসুল (সা.) সেটি আবদুল্লাহর বাহুতে বেঁধে দিলেন এবং দুআ করলেন, ‘হে আল্লাহ! আমি কাফিরদের জন্য ওর রক্ত হারাম করে দিলাম।’

আবদুল্লাহ (রা.) কিছুটা অবাক হয়ে বললেন, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ, আমি যে শাহাদাতের কাঙাল!’ তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘তুমি যখন আল্লাহর পথে যুদ্ধের জন্য বের হয়েছ, তখন যদি তুমি জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা যাও, তবে তুমি শহিদ। কিংবা তোমার বাহন যদি তোমাকে ফেলে দেয় আর তাতে তোমার মৃত্যু হয়, তবু তুমি শহিদ। এই দুটির মধ্যে যেভাবেই তোমার মৃত্যু হোক, তুমি তার পরোয়া করো না (অর্থাৎ, উভয় ক্ষেত্রেই তুমি শাহাদতের মর্যাদা পাবে)।’

তাবুকে পৌঁছার পর রাসুল (সা.)-এর কথা সত্য প্রমাণিত হয়। আবদুল্লাহ জুল-বিজাদাইন (রা.) তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হন। আর এই জ্বর তাঁর জন্য নিয়ে এল কাঙ্ক্ষিত শাহাদতের পয়গাম, তাবুকেই তিনি ইন্তেকাল করেন। (আল-ইসাবাহ, হাদিস : ৪৮০৭; সিরাতে ইবনে হিশাম : খণ্ড-২, পৃ.-৫২৮; যাদুল মাআদ : খণ্ড-৩, পৃ.-৪৭৩)

বিলাল বিন হারিস আল-মুজানি (রা.) বর্ণনা করেন, ‘আমি সেই রাতে তাঁর দাফনের দৃশ্যে শরিক ছিলাম। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মুয়াজ্জিন বিলাল (রা.) কবরের কাছে একটি আগুনের মশাল ধরে পথ দেখাচ্ছিলেন। আমি দেখলাম, স্বয়ং রাসুল (সা.) তাঁর কবরে নামেন। আর আবু বকর ও উমর (রা.) লাশ রাসুলের হাতে তুলে দিচ্ছেন। তখন রাসুল (সা.) তাঁদের বলছিলেন, ‘তোমাদের ভাইকে আমার দিকে এগিয়ে দাও।’

এরপর যখন তিনি তাঁকে কবরে শায়িত করলেন, তখন দুআ করলেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁর ওপর সন্তুষ্ট ছিলাম, আপনিও তাঁর ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান।’

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত আছে; তিনি বলেন, আমি যেন আজও দেখতে পাচ্ছি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে তাবুক যুদ্ধে; তিনি আবদুল্লাহ জুল-বিজাদাইনের কবরের ভেতরে নেমে দাঁড়িয়ে আছেন। আর আবু বকর ও উমর (রা.) লাশটি রাসুলের হাতে তুলে দিচ্ছেন।

রাসুল (সা.) বলছিলেন, ‘তোমাদের ভাইকে আমার দিকে এগিয়ে দাও।’ এরপর তিনি তাঁকে কিবলার দিক থেকে গ্রহণ করে লাহাদে (কবরের বিশেষ গর্তে) শায়িত করলেন। দাফন শেষে রাসুল (সা.) কিবলামুখী হয়ে দুই হাত তুলে দুআ করলেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁর ওপর সন্তুষ্ট ছিলাম, আপনিও তাঁর ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান।’

ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘আল্লাহর কসম! আমার খুব আকাঙ্ক্ষা হচ্ছিল, যদি এই কবরের বাসিন্দা আজ আমি হতাম! অথচ আমি তাঁর পনেরো বছর আগে ইসলাম গ্রহণ করেছি।’ অন্য বর্ণনায় এসেছে, আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-ও এই মর্যাদা দেখে একই আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিলেন।

(দালাইলুন নুবুওয়্যাহ, আবু নাঈম ইসফাহানি: খণ্ড-২, পৃ.-৫২৮; উসদুল গাবাহ, ইবনুল আসির: খণ্ড-৩, পৃ.-১২৩, ২২৮)

Home R3