৩১ জানুয়ারি, ২০২৬

ইসলামি রাজনীতি : ঐক্য, দলীয় সংকীর্ণতা এবং জোটের স্বার্থ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামি দলগুলো সবসময়ই একটি বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই দলগুলোর মধ্যে যে অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং আদর্শিক সংঘাত তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ ভোটার এবং দ্বীনদার শ্রেণির মাঝে গভীর এক হতাশার সৃষ্টি করেছে।

বিশেষ করে দেওবন্দি ঘরানার রাজনীতির প্রধান শক্তি হিসেবে পরিচিত জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম যখন মাত্র চারটি আসনের বিনিময়ে বিএনপির সাথে জোটবদ্ধ হয়, তখন থেকেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মনে নানা প্রশ্নের উদয় হয়।

এই সিদ্ধান্তটি আপাতদৃষ্টিতে একটি বড় দলের ছত্রছায়ায় থাকার কৌশল মনে হলেও, এর বিনিময়ে জমিয়তকে তাদের সর্বোচ্চ সময়, শ্রম ও মেধা বাকি ২৯৬টি আসনে বিএনপির পেছনে ব্যয় করতে হচ্ছে। অথচ দুঃখজনক বিষয় হলো, জমিয়তের জন্য ছেড়ে দেওয়া ওই চারটি আসনেই বিএনপির বহিষ্কৃত শক্তিশালী প্রার্থীরা মাঠে রয়েছেন, যা জমিয়তের বিজয়কে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা অন্যান্য ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে একটি নির্বাচনি ঐক্য গড়ার প্রচেষ্টা চললেও সেখানে আস্থার সংকট প্রকট হয়ে দেখা দেয়।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এক পর্যায়ে জামায়াতের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে এককভাবে নির্বাচনের পথে হাঁটে। স্বার্থ, অবিশ্বাস আর নিজেদের অধিকারের প্রশ্নে তৈরি হওয়া এই দূরত্ব ইসলামি ভোটব্যাংককে খণ্ডিত করে ফেলেছে। এর ফলে কোনো একটি শক্তিশালী ইসলামি ব্লক তৈরির সম্ভাবনা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক দৃশ্যটি দেখা যাচ্ছে দেওবন্দি মাসলাক ও মাশরাবের অনুসারীদের মধ্যে। দেখা যাচ্ছে, অনেক প্রাজ্ঞ আলেম স্রেফ জামায়াতের সাথে নির্বাচনি সমঝোতা করে বিভিন্ন প্রতীকে প্রার্থী হয়েছেন। কিন্তু জমিয়তের কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের কর্মীরা এই আলেমদের সমর্থন করার পরিবর্তে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। নিজ ঘরানার আলেম হওয়া সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে নানা তুহমত, আকিদা এবং হকের মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।

বিএনপির মতো একটি সেকুলার রাজনৈতিক দলের স্থানীয় কিছু বিতর্কিত নেতার পক্ষ নিতে গিয়ে নিজ মাসলাকের আলেমদের সম্মানহানি করা কেবল রাজনৈতিক প্রতিহিংসারই বহিঃপ্রকাশ।

এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, বর্তমানে ইসলামি রাজনীতিতে আদর্শিক ঐক্যের চেয়ে দলীয় সংকীর্ণতা এবং জোটের স্বার্থ বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বজাতির পিছু নিয়ে তুহমত ছড়ানোর এই সংস্কৃতি উলামায়ে কেরামের দীর্ঘদিনের অর্জিত সম্মানকে সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

রাজনীতির এই অসম দৌড়ে আলেম সমাজ যদি নিজেদের মধ্যকার কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ না করেন এবং বৃহত্তর স্বার্থে একতাবদ্ধ হতে না পারেন, তবে ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতিতে তাদের প্রভাব আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সময়ের দাবি হলো, রাজনৈতিক কৌশলের চেয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও ইনসাফকে প্রাধান্য দিয়ে একটি সুস্থ ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা।