বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতির মানচিত্র আজ অদ্ভুত এক গোলকধাঁধায় বন্দি। যে দলগুলো দেওবন্দি আদর্শ বা ইসলামি খেলাফতের কথা বলে, আজ তারা নিজেদের মধ্যেই বহুধা বিভক্ত। কিন্তু এই বিভক্তির আড়ালে কি আমরা আমাদের মূল গন্তব্য হারিয়ে ফেলছি না?
জমিয়ত উলামায়ে ইসলাম আজ দুই ভাগে বিভক্ত, খেলাফত আন্দোলনও আজ দ্বিধাবিভক্ত—যার এক অংশ আদি আদর্শে অটল, অন্য অংশ ভিন্ন মেরুতে। কিন্তু দিনশেষে এরা সবাই দেওবন্দি বা হাফেজ্জী হুজুরের উত্তরসূরি। সাধারণ মানুষের উচিত দল নয়, বরং আদর্শকে ভোট দেওয়া। জমিয়ত বা খেলাফত আন্দোলন যে রূপেই থাকুক, যদি তারা মূলনীতিতে অটল থাকে, তবে উভয় অংশই আমাদের সমর্থনের দাবিদার। এখানে ব্যক্তির চেয়ে নীতি বড়।
ইসলামী ঐক্যজোট একসময় আওয়ামী স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বড় শক্তি ছিল, কিন্তু আজ তা চার ভাগে বিভক্ত। কেউ কেউ ক্ষমতার লোভে স্বৈরাচারের সহযোগী হয়েছে, কেউবা নীতি হারিয়েছে। খেলাফত মজলিস বা নেজামে ইসলামের মতো ঐতিহ্যবাহী দলগুলোকেও আজ নানা টানাটানির শিকার হতে হচ্ছে। এমনকি চরমোনাইয়ের মতো শক্তিগুলোকেও বৃহত্তর স্বার্থে মূল্যায়নের দাবি রাখে। আমাদের মনে রাখতে হবে, দুধের মধ্যে এক ফোঁটা চনা (মূত্র) যেমন পুরো দুধকে নষ্ট করে দেয়, তেমনি জোটের নামে আদর্শহীন শক্তির সাথে মেশা মানেই হলো নিজের স্বকীয়তা বিসর্জন দেওয়া।
সাধারণ ভোটারদের মনে প্রশ্ন আসতেই পারে—এতগুলো ভাগে বিভক্ত দলকে কীভাবে ভোট দেবেন? এর সমাধান হতে পারে ড. ইউনূস সরকারের কাছে একটি বিশেষ দাবি: ইসলামি দলগুলোকে একীভূত করে একটি ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের আয়োজন করা। জনগণ স্পষ্ট করে বলুক তারা ইসলামি মূল্যবোধ চায় কি চায় না। এতে করে সুবিধাবাদী রাজনীতি আর আদর্শিক রাজনীতির মধ্যকার ‘চুল কা চুল, পানি কা পানি’ ফয়সালা হয়ে যাবে।
ইসলামি ঘরানার দলগুলোকে যারা জোটের নামে ব্যবহার করে, তাদের চিনতে হবে। ইতিহাস সাক্ষী—দাঁড়িপাল্লা হোক কিংবা ধানের শীষ, ক্ষমতার লড়াইয়ে তারা অনেকেই একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। কবিতায় যেমন বলা হয়েছে, ‘দাঁড়িপাল্লা ধানের শীষ, দুই সাঁপের একই বিষ/এর সাথে মিলেমিশে ইসলামের ভাবনা ভাবিস/বোকামি ছাড়া এ যে কিছু না… ওরা যে একই পাখির দুই ডানা।’
যারা ইসলামি লেবাস পরে ভিন্ন আদর্শের দালালি করে, তারা মূলত ‘গুপ্ত’ শত্রু। তারা কখনোই ইসলামের প্রকৃত বন্ধু ছিল না। আমাদের অবস্থান হতে হবে স্পষ্ট—খাঁটি ইসলামি আদর্শ ছাড়া কোনো জোড়াতালি দেওয়া জোটে আমরা ভোট দেব না। যারা ইসলাম, দেওবন্দিয়ত এবং জনগণের শত্রুদের সাথে আপস করে, তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এখনই সময়।