রাত পোহালেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ চলবে।ইতিমধ্যে ভোট গ্রহণে সবধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯৯টি আসনে ৪২ হাজার ৬৫১টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ করা হবে। শেরপুর-৩ আসনে একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে নির্বাচন বাতিল করা হয়েছে। ওই আসনের ১২৮টি কেন্দ্রে ভোট হবে না; পরে নতুন তফসিল ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
ইসির তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধিত ৬০টি দলের মধ্যে এবার অংশ নিচ্ছে ৫০টি দল। মোট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী দুই হাজার ২৮ জন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী এক হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। প্রার্থীদের মধ্যে নারী ৮৩ জন—দলীয় ৬৩ ও স্বতন্ত্র ২০ জন। বিএনপির নারী প্রার্থী ১০ জন। জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য ইসলামপন্থী দলগুলোর কোনো নারী প্রার্থী নেই।
দেশে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে নারী ছয় কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০, পুরুষ ছয় কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ এবং তৃতীয় লিঙ্গের এক হাজার ২৩২ জন। শেরপুর-৩ আসনের চার লাখ ১৩ হাজার ৩৩৭ জন ভোটার এবার ভোট দিতে পারবেন না। ফলে আগামীকাল ভোট দিতে পারবেন ১২ কোটি ৭২ লাখ ৯৮ হাজার ৪৫৬ জন।
নির্বাচনে বিদেশি পর্যবেক্ষক থাকছেন ৩৯২ জন। দেশি পর্যবেক্ষক থাকতে পারেন ৪৪ হাজার ৯৯৫ জন। প্রায় ৯ হাজার ৭০০ জন সাংবাদিক নিবন্ধন করেছেন, তাঁদের মধ্যে বিদেশি সাংবাদিক প্রায় ১৫৬ জন।
রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ৫৯৮ জন। এ ছাড়া প্রিজাইডিং, সহকারী প্রিজাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বে থাকবেন সাত লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মাঠে থাকবেন সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনীর ৯ লাখ ১৯ হাজার ২৮০ সদস্য। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর এক লাখ তিন হাজার, নৌবাহিনীর পাঁচ হাজার, বিমানবাহিনীর সাড়ে তিন হাজার, বিজিবির ৩৭ হাজার ৪৫৩, কোস্ট গার্ডের তিন হাজার ৫৮৫, পুলিশের এক লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩, র্যাবের ৯ হাজার ৩৪৯, আনসারের পাঁচ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৮ এবং বিএনসিসির এক হাজার ৯২২ সদস্য রয়েছেন। পাশাপাশি দায়িত্বে থাকবেন প্রায় দুই হাজার ১০০ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ৬৫৭ বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট।
প্রথমবারের মতো এবার নির্বাচনে ড্রোন, বডি-ওর্ন ক্যামেরা ও ব্যাপক সিসিটিভি নজরদারি ব্যবহার করা হচ্ছে। ইসি জানিয়েছে, ৯০ শতাংশের বেশি কেন্দ্রে সিসিটিভি নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রচারণা শেষ হওয়ার পর গত মঙ্গলবার বড় ধরনের কোনো সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি। প্রায় ২০ দিনের প্রচারণা শেষে এখন প্রার্থীরা ব্যস্ত জয়-পরাজয়ের হিসাব কষতে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটও হচ্ছে, যার ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে সংবিধান সংশোধনের একগুচ্ছ প্রস্তাব।
দলীয় সরকারের অধীনে টানা তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের পর এবারের ভোট নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে হচ্ছে। পোস্টাল ব্যালটে প্রবাসী, নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কারাবন্দী ভোটাররা ভোট দিচ্ছেন।
গতকাল মঙ্গলবার জাতির উদ্দেশে ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, এবারের নির্বাচন একটি গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বৈষম্য ও বঞ্চনার সাংবিধানিক প্রকাশ ঘটবে ব্যালটের মাধ্যমে। তিনি শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক ভোটের আশা প্রকাশ করেন।
তবে বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অস্ত্র, পেশিশক্তি, ধর্ম ও পুরুষতান্ত্রিকতার প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নির্বাচন কমিশনের আইনশৃঙ্খলা মনিটরিং সেলের সঙ্গে বৈঠক শেষে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোটাধিকার চর্চা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। টিআইবির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইসলামপন্থী দলগুলোর প্রার্থী মোট প্রার্থীর ৩৬ শতাংশের বেশি, যা গত পাঁচ নির্বাচনের মধ্যে সর্বোচ্চ। নারী প্রার্থীর অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত একটি বড় দল নিবন্ধন স্থগিত থাকায় নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। বড় একটি দলের অনুপস্থিতিতে নির্বাচন কতটা অংশগ্রহণমূলক হবে, সে প্রশ্নও রয়েছে।
২৯৯টি আসনের মধ্যে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী রয়েছেন ২৯০ জন। বাকি নয়টি আসনে জোটের প্রার্থীরা নিজস্ব প্রতীকে লড়ছেন। জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীক রয়েছে ২২৮টি আসনে। সাতটি আসনে প্রতীক প্রত্যাহারের আবেদন করলেও সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় তা বহাল থাকে।
এদিকে, নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছেন, তফসিল ঘোষণার পর কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও সামগ্রিক পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তিনি বলেন, গত কয়েক সপ্তাহে সারা দেশে ৮৫০টির বেশি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ব্যালট একসঙ্গে গণনা করা হবে। কেন্দ্রের প্রাথমিক ফল রিটার্নিং কর্মকর্তার মাধ্যমে কমিশনে পাঠানো হবে। অধিকাংশ আসনের ফল মধ্যরাতের মধ্যেই পাওয়া যেতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।

