১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ইসলামপন্থি দলগুলো নিজেদের স্বকীয়তা প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ইসলামপন্থি দলগুলো যে বিপুল গণজোয়ারের প্রত্যাশা করেছিল, ব্যালট বক্সে তার পূর্ণ প্রতিফলন না ঘটাকে অনেকেই ‘ভরাডুবি’ বা ‘প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল না পাওয়া’ হিসেবে দেখছেন।

নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। জামায়াতে ইসলামী তাদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৬৯টি আসন পেলেও অন্যান্য ইসলামপন্থি দল—যেমন : ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম—তালিকায় প্রায় অদৃশ্যই থেকেছে। এর পেছনে কারণ কী কী থাকতে পারে, একটু দেখা যাক।

গণঅভ্যুত্থানের পর ভোটাররা একটি নতুন ধারার রাজনীতির প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু দিনশেষে ভোটাররা বিশেষ করে গ্রামীণ এবং মধ্যবিত্ত ভোটাররা ‘স্থিতিশীলতা’ এবং ‘অভিজ্ঞতা’র প্রশ্নে বিএনপির ওপর বেশি ভরসা করেছে। ইসলামপন্থি দলগুলো নিজেদের সেই নির্ভরযোগ্য ‘বিকল্প শক্তি’ হিসেবে জনগণের কাছে শতভাগ প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি।

এই নির্বাচনকে বলা হচ্ছে পৃথিবীর প্রথম ‘জেন-জি অনুপ্রাণিত’ নির্বাচন। তরুণ প্রজন্ম যারা সংস্কার এবং আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় বিশ্বাসী, তাদের বড় একটি অংশ ইসলামপন্থি দলগুলোর কট্টর বা রক্ষণশীল অবস্থান থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখেছে। বিশেষ করে নারীর অধিকার ও কর্মসংস্থান নিয়ে নেতাদের বিতর্কিত মন্তব্য নারী ভোটারদের মনে সংশয় তৈরি করেছিল।

ইসলামপন্থি দলগুলোর মধ্যে একটি বড় ঐক্য গড়ার চেষ্টা থাকলেও তা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। তন্মধ্যে ভোটের বিভাজন অন্যতম। সমমনা দলগুলোর আলাদা প্রার্থী এবং অনেক জায়গায় জনপ্রিয় স্বতন্ত্র প্রার্থীদের উপস্থিতি ইসলামপন্থি ভোটব্যাংকে ভাগ বসিয়েছে।

তৃণমূলের ক্ষোভও এ ক্ষেত্রে নিয়মত ভূমিকা পালন করেছে। অনেক বড় দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্থানীয় নেতাকর্মীরা স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছেন, যা দলীয় প্রার্থীর জয়কে কঠিন করে তুলেছে।

ভোটের লড়াইয়ে আধুনিক অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং ডিজিটাল সংস্কারের যে রূপরেখা প্রয়োজন ছিল, ইসলামপন্থি দলগুলোর ইশতেহারে তার চেয়ে বরং আদর্শিক ও ধর্মীয় আবেগ বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। সাধারণ ভোটাররা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মসংস্থানের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে রায় দিয়েছেন।

ইসলামপন্থি বলয়ে জামায়াতে ইসলামী একটি বড় জায়গা দখল করে নিলেও, তাদের জোটের শরিক বা অন্যান্য ছোট দলগুলো (যেমন খেলাফত মজলিস বা জমিয়ত) নিজেদের স্বকীয়তা প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভোটাররা জামায়াতকে বাদ দিয়ে সরাসরি বিএনপিকেই বেছে নিয়েছে যাতে ভোট নষ্ট না হয়।

তাই এখন থেকেই ইসলামপন্থি দলগুলোকে ভবিষ্যৎ করিণীয় নির্দারণ এবং পরবর্তী নির্বাচনের টার্গেট নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।