১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের নির্বাচনের খবর

শিক্ষার্থী নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনে শেখ হাসিনার দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ের শাসনামলের অবসান ঘটার পর ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন সময় পেরিয়ে ভোট দিয়েছে বাংলাদেশ।

দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে হওয়া এ ভোটের দিকে কেবল বাংলাদেশের মানুষই নয়, চোখ রয়েছে প্রতিবেশী সব দেশেরও।বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের খবর ঘটা করে প্রচার করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো।

রয়টার্স, বিবিসি, আল জাজিরা, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) খবরে বিশ্বের প্রথম ‘জেন জি’ নির্বাচন হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছে বাংলাদেশের ভোট।

রয়টার্স: বৃহস্পতিবার গোটা দিন ভোট শেষে প্রাথমিক ফল ঘোষণায় বিএনপির বিজয়ের খবর প্রকাশ করেছে রয়টার্স।
শিরোনামে বলা হয়েছে- ‘বাংলাদেশের বিএনপি জানিয়েছে- পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে বিজয়ী করা হয়েছে’।
সংবাদমাধ্যমটি প্রতিবেদনে জানায়, বিএনপির নির্বাচনী ইতিহাসে সর্বোচ্চ আসন জিতে বিজয়ী হয়েছে। বেসরকারি ফলে ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে বিএনপি দুই শতাধিক আসনে জয় পেয়েছে। এর আগে ২০০১ সালে বাংলাদেশের অন্যতম বড় এই রাজনৈতিক দল ১৯৩টি আসন জিতেছিল।
বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের নবগঠিত দল এনসিপি ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে কেবল পাঁচটি আসনে জয় পেয়েছে। যা প্রমাণ করেছে শিক্ষার্থীদের দল হয়েও এনসিপি আন্দোলনের শক্তিকে রাজপথে রাজনীতির শক্তিতে রূপান্তরিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
বিবিসি: ‘বাংলাদেশের নির্বাচনে ভোট গণনায় এগিয়ে বিএনপি’ শিরোনামে খবর প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
এতে বলা হয়, বেসরকারি ফলে এগিয়ে বিএনপি, দ্বিতীয় স্থানে আছে ইসলামপন্থি জামায়াতে ইসলামী। এই বিজয়কে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
লন্ডনে ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরেই তিনি বিজয়ের মুখ দেখছেন বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ভোটাররা এবার কেবল নতুন সরকার নির্বাচনের জন্যই ভোট দেননি; সংবিধান পরিবর্তনের প্রশ্নে গণভোটেও অংশ নিয়েছেন।
আল জাজিরা: ‘বাংলাদেশ নির্বাচন: তারেক রহমানের বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাবি’ শিরোনাম করেছে আল জাজিরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের সবশেষ তথ্যে বিএনপি নেতারা দাবি করেছে- তারা একক সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। দলের নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই ফলকে বিএনপির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দেশের জাতীয় নির্বাচনে ইতিহাসের সেরা ফলাফল অর্জন করে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে জামায়াত জোট।
দলীয় নেতারা এই ফলকে ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন এবং এটিকে তাদের সংগঠনগত সম্প্রসারণ ও ভোটার সমর্থনের প্রতিফলন বলে মন্তব্য করেছেন।
এপি: বার্তাসংস্থা এপির শিরোনাম ‘২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচনে বিজয় দাবি বিএনপির’।
খবরে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রথম নির্বাচনে বিজয় দাবি করে পরবর্তী সরকার গঠনের পথে হাঁটছে বিএনপি।
দলের মিডিয়া ইউনিট শুক্রবার এক্স পোস্টে জানিয়েছে, তারা সংসদে স্বতন্ত্রভাবে সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ট আসন পেয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন এখনও চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করেনি।
বিএনপির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী তারেক রহমান ১৭ বছরের স্বেচ্ছা নির্বাসনের পর গত ডিসেম্বরে লন্ডন থেকে দেশে ফেরেন। তিনি প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সন্তান।
দেশের জনগণকে অভিনন্দন জানিয়ে বিএনপিকে জয়ী করায় কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রুহুল কবির রিজভী। এছাড়া তারেক রহমানের প্রেস সচিব সালেহ শিবলি বলেন, ‘বিএনপি নেতা তার সমর্থকদের বিজয় মিছিলের পরিবর্তে শুক্রবার নামাজের পাশাপাশি বিশেষ প্রার্থনা (দোয়া) করার আহ্বান জানিয়েছেন।’
এনডিটিভি: বাংলাদেশের নির্বাচনে চোখ রেখেছে ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলোও। দেশটির প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরের শিরোনাম- ‘১৭ বছর নির্বাসন শেষে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে বাংলাদেশের “কৃষ্ণ কুমার” তারেক রহমান’।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তারেক রহমানের নেতৃত্বে এগিয়ে আছে বিএনপি, তিনি হচ্ছেন দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। রাতে আনুষ্ঠানিক ফলাফল না এলেও নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও দলীয় সূত্র অনুযায়ী তিনি ঢাকা-১৭ এবং বগুড়া-৬ দুই আসন থেকেই নির্বাচিত হয়েছেন।
এনডিটিভির পর্যালোচনায় বলা হয়, নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করা।
ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সময় ভারত ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র। তবে তার সরকারের পতনের পর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে এবং সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তা প্রকাশ্যভাবে ‘শত্রুতাময়’ হয়ে উঠেছে।
তারেক রহমানও সম্প্রতি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন ভারতের সঙ্গে ‘কিছু সমস্যা’ রয়েছে এবং তিনি চাইবেন ‘পারস্পরিক সম্মান, পারস্পরিক বোঝাপড়া’ ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলতে।
দিল্লি যখন শেখ হাসিনা এবং তার দলের সদস্যদের রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছে, তখন ভারত এবং বাংলাদেশ কি আবার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ফিরিয়ে আনতে পারবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, ‘এটা নির্ভর করে পরিস্থিতির ওপর। তাদের ওপরও অনেক কিছুই নির্ভর করবে।’
দ্য গার্ডিয়ান: যুক্তরাজ্যের আরেক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান গুরুত্ব দিয়েছে বিএনপি নেতা তারেক রহমানের একক সাক্ষাৎকারের ওপর। ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে ফেরা তারেক রহমানকে আগামীর সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করে গার্ডিয়ান লিখেছে, তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বা আপসহীন নীতির অঙ্গীকার করেছেন।
গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন ধ্বংসের মুখে এবং যেকোনো নতুন সরকারের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে জবাবদিহি ফিরিয়ে আনা হবে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
সিএনএন: মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন তাদের প্রতিবেদনে একটি ভিন্ন ও গভীর বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে। তাদের মতে, ‘বিপ্লবে জিতেছে জেনারেশন জি, কিন্তু নির্বাচনে রাজত্ব করছে পুরোনো রাজনীতিকেরাই’।
সিএনএন বলছে, তরুণেরা যে নতুন ধারার রাজনীতির স্বপ্ন দেখেছিল, রাজপথের সেই আকাঙ্ক্ষা নির্বাচনের মাঠে পুরোপুরি প্রতিফলন ঘটেনি। এ ছাড়া নারীদের অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের পথে ইসলামপন্থী দলগুলোর শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে তরুণদের একাংশের মধ্যে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার অনুভূতির কথাও উল্লেখ করেছে সংবাদমাধ্যমটি।