আন্তর্জাতিক

হামাস যেভাবে ইসরায়েলে হামলা চালানোর জন্য বাহিনী তৈরি করেছিল

বাংলার কথা বাংলার কথা

প্রকাশিত: ১১:৩৭ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ৪, ২০২৩

৭ অক্টোবর ইসরায়েলের ওপর প্রাণঘাতী হামলায় হামাসের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল পাঁচটি সশস্ত্র ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী। ২০২০ সাল থেকে সামরিক মহড়ায় একসঙ্গে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরই তারা এই হামলা চালায়। এই গোষ্ঠীগুলি গাজায় যে যৌথ মহড়া চালিয়েছিল তার সঙ্গে ইসরায়েলের উপর প্রাণঘাতী হামলার সময় ব্যবহৃত কৌশলের সাদৃশ্য রয়েছে। তারা এসব মহড়া চালিয়েছিল এমন স্থানে যেখান থেকে ইসরায়েলের সঙ্গে ‘সীমানার’ দূরত্ব এক কিলোমিটারেরও কম এবং এই ভিডিও তারা সমাজমাধ্যমেও পোস্ট করে। এই মহড়ার সময় জিম্মিদের কীভাবে নিজেদের হেফাজতে নেওয়া হবে, কম্পাউন্ডে হামলা চালানোর কৌশল এবং ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা-সহ একাধিক বিষয় তারা অনুশীলন করে। তাদের শেষ মহড়াটি হয়েছিল ৭ই অক্টোবরের হামলার মাত্র ২৫ দিন আগে। বিবিসি আরবি এবং বিবিসি ভেরিফাই নানা প্রমাণ সংগ্রহ করেছে যা থেকে দেখা যায়, হামাস কীভাবে গাজার বিভিন্ন গোষ্ঠীকে একত্রিত করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের উপর হামলা চালিয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে যুদ্ধের আকার নেয়।

‘ঐক্যের প্রতীক’
হামাসের প্রধান নেতা ইসমাইল হানিয়েহ ২০২০ সালের ২৯শে ডিসেম্বর চারটি মহড়ার মধ্যে প্রথমটিকে (যার কোডনেম ছিল স্ট্রং পিলার) গাজার বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে “শক্তিশালী বার্তা এবং ঐক্যের চিহ্ন” হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। গাজার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হামাস ছিল ওই জোটের সবচাইতে প্রভাবশালী শক্তি। “যৌথ অপারেশন রুম”-এর তত্ত্বাবধানে হওয়া মহড়াগুলি অনেকটা ‘ওয়ার গেম’-এর মতো যাতে অংশগ্রহণের জন্য আরও ১০ টি সশস্ত্র ফিলিস্তিনি উপগোষ্ঠী একত্রিত করতে সমর্থ হয়েছিল ওই জোটটি। গাজার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে একটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধীনে আনার জন্য ২০১৮ সালে এই কাঠামোটি তৈরি করা হয়েছিল। হামাস ২০১৮ এর আগে পর্যন্ত গাজার দ্বিতীয় বৃহত্তম সশস্ত্র দল প্যালেস্টানিয়ান ইসলামিক জিহাদ (পিআইজে)-এর সঙ্গে সমন্বয়ে কাজ করত। হামাসের মতোই, পিআইজে-ও যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য দেশে নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষিত। এর আগেও হামাস অন্যান্য গোষ্ঠীর সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে একাধিক সংঘাতের সময় যুদ্ধ করেছে, তবে ২০২০ সালের মহড়াটি প্রমাণ করে এসব উপগোষ্ঠী এইবার একত্রিত হয়েছে। হামাসের নেতা বলেছেন, প্রথম মহড়া ছিল সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ‘স্থায়ী প্রস্তুতির’ প্রতিফলন।

প্রসঙ্গত, ২০২০ সালের মহড়াটি ছিল তিন বছর ধরে অনুষ্ঠিত হওয়া চারটি যৌথ মহড়ার মধ্যে প্রথম, যার প্রতিটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় প্রকাশ করা রয়েছে। মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামে পোস্ট করা ফুটেজে ‘স্ট্রং পিলার’ মহড়ার সময় হামাসের সঙ্গে প্রশিক্ষণ নেওয়া পিআইজে-সহ ১০টি গোষ্ঠীকে দৃশ্যত চিহ্নিত করেছে বিবিসি। পাঁচটি গোষ্ঠী ৭ই অক্টোবরে হওয়া ওই হামলায় অংশ নেওয়ার দাবি জানিয়ে ভিডিও পোস্ট করেছিল। অন্য তিনটি গোষ্ঠীও টেলিগ্রামে লিখিত বিবৃতি দিয়ে ওই একই হামলায় অংশ নেওয়ার দাবি জানায়। গত ৭ই অক্টোবর ইসরায়েল থেকে গাজায় বন্দী হিসেবে নিয়ে যাওয়া একাধিক নারী ও শিশুকে খুঁজে বের করার জন্য হামাসের ওপর চাপ বাড়ার পর এই গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পিআইজে, মুজাহিদিন ব্রিগেড এবং আল-নাসের সালাহ আল-দীন ব্রিগেড নামে তিনটি গোষ্ঠী দাবি করেছে যে হামাসের পাশাপাশি তারাও ওই দিন ইসরায়েলি জিম্মিদের আটক করেছিল। গাজায় অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর প্রচেষ্টা হামাসের জিম্মিদের খুঁজে বের করার ওপর নির্ভর করছে।

উল্লেখ্য, এই গোষ্ঠীতে কট্টর ইসলামপন্থী থেকে তুলনামূলকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ- বিস্তৃত মতাদর্শ অনুসরণ করে এমন সংগঠন অংশগ্রহণ নিলেও তারা প্রত্যেকেই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সহিংস হামলা চালানোর বিষয়ে একমত ছিল। হামাসের বিবৃতিতে বারবার গাজার বিভিন্ন সশস্ত্র উপগোষ্ঠীর মধ্যে ‘ঐক্যের’ বিষয়ের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। একথাও জানানো হয় ইসরায়েলের উপর আক্রমণের পরিকল্পনায় তারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করলেও যৌথ মহড়ায় প্রতিটি গোষ্ঠী সমান অংশীদার ছিল। প্রথম মহড়ার ফুটেজে দেখা যায়, একটি বাঙ্কারে মহড়া পরিচালনা করতে আসা মুখোশধারী কমান্ডারদের। রকেট নিক্ষেপের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মহড়া। পরের দৃশ্যে দেখা যায়, মহড়া চলাকালীন সশস্ত্র যোদ্ধারা ইসরায়েলি পতাকা দিয়ে চিহ্নিত একটি নকল ট্যাংকের উপর হামলা চালাচ্ছে। তাদের গোষ্ঠীরই এক সদস্যকে বন্দী সাজিয়ে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, ভবনগুলির উপর হামলা চালাতেও দেখা যায় ওই মহড়ার ভিডিও ফুটেজে। আমরা ভিডিও এবং ওই ভয়ঙ্কর ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবৃতি থেকে জানতে পেরেছি, প্রায় একই রকমভাবে ৭ই অক্টোবর সৈন্যদের আটক এবং বেসামরিক নাগরিকদের নিশানা করার কৌশল ব্যবহার করা হয়েছিল। ওইদিন হামাসের আক্রমণে প্রায় ১,২০০ মানুষের মৃত্যু হয় এবং আনুমানিক ২৪০ জনকে জিম্মি করা হয়েছিল।

পুরো বিশ্বের কাছে ঘোষণা
প্রায় এক বছর পরে দ্বিতীয় ‘স্ট্রং পিলার’ মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ইজ্জেদিন আল-কাসাম ব্রিগেডের (হামাসের সশস্ত্র শাখার আনুষ্ঠানিক নাম) কমান্ডার আয়মান নোফাল বলেন, ২০২১ সালের ২৬ ডিসেম্বর মাসের মহড়ার লক্ষ্য ছিল প্রতিরোধকারী দলগুলির ঐক্য নিশ্চিত করা। এই মহড়াগুলি ‘শত্রুদের জানাবে, গাজা সীমান্তের দেয়াল ও প্রকৌশল ব্যবস্থা তাদের রক্ষা করতে পারবে না। হামাসের আরেকটি বিবৃতিতে বলা হয়, এই যৌথ সামরিক মহড়ার উদ্দেশ্য ছিল ‘গাজার নিকটবর্তী অঞ্চলের মুক্তিকে ত্বরান্বিত করাও।’ এই মহড়ার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছিল ২০২২ সালের ২৮ শে ডিসেম্বর এবং এই ঘটনাকে চিহ্নিত করার জন্য যোদ্ধাদের প্রচারমূলক চিত্রগুলি প্রকাশ করা হয়েছিল যাতে ভবনগুলি খালি এবং একটি সামরিক ঘাঁটির প্রতীক হিসেবে তৈরি একটি বেস-এ ট্যাঙ্ক দখল করতে দেখা যায়। মহড়াগুলি ইসরায়েলেই হয়েছে, তাই এটি বিশ্বাসযোগ্য নয় যে দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলি তাদের নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেনি। এর আগে হামাসের প্রশিক্ষণ ব্যাহত করতে ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ) বিমান হামলা চালিয়েছে। স্ট্রং পিলার মহড়ার জন্য ব্যবহৃত সাইটে ২০২৩ সালের এপ্রিলে তারা প্রথম বোমা বর্ষণ করে।

হামলার কয়েক সপ্তাহ আগে গাজা সীমান্তের কাছে নজরদারির কাজে নিবিষ্ট নারী রক্ষীরা অস্বাভাবিক উচ্চতায় হওয়া ড্রোন কার্যকলাপের বিষয়ে সতর্ক করেছিল। হামাস তাদের অবস্থানের প্রতিলিপি সহ পর্যবেক্ষণ পোস্টগুলি দখল করার প্রশিক্ষণ নিচ্ছে বলেও তারা জানিয়েছিল। কিন্তু ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সতর্কবার্তাগুলি উপেক্ষা করা হয়েছে। গাজায় আইডিএফের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমির আভিভি বলেন, অনেক গোয়েন্দা তথ্য ছিল যে তারা এই প্রশিক্ষণগুলি নিচ্ছে- সর্বোপরি, ভিডিওগুলি জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়েছে এবং এটি সীমান্ত (ইসরায়েলের সাথে) থেকে মাত্র কয়েকশত মিটার দূরে ঘটছে। তবে, সামরিক বাহিনী এই মহড়া সম্পর্কে জানলেও তারা ‘কিসের জন্য প্রশিক্ষণ নিচ্ছে তা তারা জানতে পারেনি। আইডিএফ জানিয়েছে, তারা ২০২৩ সালের ১৭ই অক্টোবর হামাসের প্রথম জ্যেষ্ঠ সামরিক নেতা নোফালকে ‘নির্মূল’ করে।

অগোচরে লুকিয়ে থাকার শৈলী
মহড়াটি বাস্তবসম্মত কিনা তা নিশ্চিত করতে হামাস অনেক দূর পর্যন্ত গিয়েছিল। মহড়ার অংশ হিসেবে যোদ্ধারা ২০২২ সালে আইডিএফ নিয়ন্ত্রিত গাজা ও ইসরায়েলের মধ্যস্থিত রুট- এরেজ ক্রসিং থেকে মাত্র ২.৬ কিলোমিটার (১.৬ মাইল) দূরে নির্মিত একটি নকল ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছিল। গাজার সুদূর উত্তরে, ‘ব্যারিয়ার’ থেকে মাত্র ৮০০ মিটার (০.৫ মাইল) দূরে অবস্থিত ওই অঞ্চলের আকাশের চিত্রের সঙ্গে প্রশিক্ষণের ফুটেজে দেখা জায়গাটির ভৌগলিক বৈশিষ্ট্যগুলির সামঞ্জস্য লক্ষ্য করে নির্দিষ্ট স্থানটিকে চিহ্নিত করেছে বিবিসি ভেরিফাই। নভেম্বর, ২০২৩ পর্যন্ত ওই স্থানটি এখনও বিং মানচিত্রে দৃশ্যমান। প্রশিক্ষণ শিবিরটি একটি ইসরায়েলি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার এবং উত্তলিত পর্যবেক্ষণ বাক্সের ( যে নিরাপত্তা বাধারগুলি ইসরায়েল শত শত মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে) ১.৬ কিলোমিটার (১ মাইল) এর মধ্যে অবস্থিত ছিল। মক বেসটি মাটির স্তর থেকে কয়েক মিটার নীচে খনন করা জমিতে রয়েছে, তাই এটি নিকটবর্তী কোনও ইসরায়েলি টহলদলের কাছে তাত্ক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান নাও হতে পারে – তবে বিস্ফোরণের পর ধোঁয়া অবশ্যই নজরে আসবে। বিশেষত, যখন আইডিএফ-এর বিমান নজরদারি ব্যবহার করে বলে জানা গিয়েছে।

হামাস এই স্থানটি বিভিন্ন ইমারতে হামলা, বন্দুক দেখিয়ে জিম্মি করা এবং নিরাপত্তা বাধা ধ্বংস করার জন্য ব্যবহার করেছিল। বিবিসি ভেরিফাই গাজা জুড়ে নয়টি জায়গায় ১৪ টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র শনাক্ত করতে স্যাটেলাইট চিত্র-সহ সর্বজনীনভাবে উপলব্ধ তথ্য ব্যবহার করেছে। এমনকি তারা জাতিসংঘের সহায়তাপ্রাপ্ত সংস্থা বিতরণ কেন্দ্র থেকে ১.৬ কিলোমিটার (১ মাইল) এরও কম দূরত্বে থাকা একটি স্থানে দু’বার প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। ওই স্থানটি সংস্থাটি দ্বারা ২০২২ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত একটি অফিসিয়াল ভিডিওর পটভূমিতেও দৃশ্যমান ছিল। তথাকথিত যৌথ কমিটি তাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে সামরিক উর্দি পরিহিত পুরুষদের গাজা ‘ব্যারিয়ার’ বরাবর সামরিক কার্যকলাপের নজরদারি করার ছবি প্রকাশ করে। দুই দিন পরে, চতুর্থ ‘স্ট্রং পিলার’ সামরিক মহড়াটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং ত৭ই অক্টোবরের মধ্যে, নজিরবিহীন ওই আক্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত রণকৌশল অভ্যাস করা হয় সে সময়। যোদ্ধাদের একই ধরনের সাদা টয়োটা পিকআপ ট্রাকে চড়তে দেখা গেছে যা পরের মাসে দক্ষিণ ইসরায়েলের মধ্য দিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে।

প্রোপাগান্ডা ভিডিওতে দেখা যায়, বন্দুকধারীরা নকল ভবনে হামলা চালাচ্ছে এবং ভেতরে থাকা ডামি লক্ষ্যবস্তুতে গুলি বর্ষণ করছে, পাশাপাশি একটি নৌকা ও জলের নিচে ডুবুরিদের ব্যবহার করে সৈকতে হামলা চালানোর প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা ৭ই অক্টোবর তাদের উপকূলে হামাসের নৌকা নৌকাগুলি নোঙর হওয়া থেকে আটকায়। তবে হামাস স্ট্রং পিলার প্রোপাগান্ডা ভিডিও-র অংশ হিসাবে তাদের মোটরসাইকেল এবং প্যারাগ্লাইডার ব্যবহার করে প্রশিক্ষণের কোনও প্রচার করেনি। ৭ই অক্টোবরের তিন দিন পর হামাসের পোস্ট করা একটি প্রশিক্ষণ ভিডিওতে মোটরসাইকেল চলাচলের জন্য বেড়া ও বাধা ভেঙে ফেলতে দেখা যায়। ওই একই রীতি অনুসরণ করে দক্ষিণ ইসরায়েল কমিউনিটিতে প্রবেশ করতে দেখা গেছে। এর আগে একই ধরনের ভিডিও দেখা যায়নি। প্যারাগ্লাইডিং সরঞ্জাম ব্যবহার করা যোদ্ধাদের ফুটেজও ৭ই অক্টোবরের আক্রমণ শুরু না হওয়া পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি।

হামলার দিন শেয়ার করা একটি প্রশিক্ষণ ভিডিওতে দেখা যায়, বন্দুকধারীরা গাজার দক্ষিণাঞ্চলের রাফার উত্তরে অবস্থিত একটি বিমানবন্দরে কিববুৎজে অবতরণ করছে। বিবিসি ভেরিফাই প্রমাণ পেয়েছে যে এটি ২০২২ সালের ২৫ আগস্টের কিছু সময় আগে রেকর্ড করা হয়েছিল এবং ঈগল স্কোয়াড্রন নামে একটি কম্পিউটার ফাইলে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। হামাস তাদের বিমান বিভাগের জন্য এই নাম ব্যবহার করে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে প্যারাগ্লাইডার পরিকল্পনাটির উপর এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করা হয়েছে।

বিস্ময়কর বস্তু
৭ই অক্টোবরের আগে আইডিএফ কমান্ডারদের উক্তি দিয়ে সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজা উপত্যকায় হামাসের প্রায় ৩০ হাজার যোদ্ধা রয়েছে। এও মনে করা হয়েছিল যে হামাস ছোট ছোট গোষ্ঠী থেকে কয়েক হাজার যোদ্ধাকে নিজেদের দলে ভেড়াতে পারে। অন্যান্য গোষ্ঠীর সমর্থন ছাড়াই ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে হামাস এখন পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী। যা ইঙ্গিত দেয় যে অন্যান্য গোষ্ঠীগুলিকে উদ্বুদ্ধ করার পেছনে ছিল, গাজার অভ্যন্তরে সমর্থন বাড়ানো এবং নিজেদের সদস্যদের সংখ্যা জাহির করা। আইডিএফ এর আগে অনুমান করেছিল যে ১,৫০০ যোদ্ধা ৭ অক্টোবরের অভিযানে অংশ নিয়েছিল। চলতি মাসের শুরুর দিকে টাইমস অব ইসরাইলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আইডিএফ এখন বিশ্বাস করে যে এই সংখ্যা তিন হাজারের কাছাকাছি।

প্রকৃত সংখ্যা যাই হোক না কেন, এর অর্থ গাজার মোট সশস্ত্র কর্মীদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে সামান্য একটি ভাগ ওই হামলায় অংশ নিয়েছিল। হামলা বা স্ট্রং পিলার মহড়ায় ছোট ছোট দলের কতজন যোদ্ধা অংশ নিয়েছিল তার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা যাচাই করা সম্ভব নয়। লেবাননের সেনাবাহিনীর সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিশাম জাবের, বর্তমানে মিডল ইস্ট সেন্টার ফর স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চের নিরাপত্তা বিশ্লেষক, বলেছেন তিনি বিশ্বাস করেন যে কেবল হামাসই চূড়ান্ত পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত ছিল এবং সম্ভবত [তারা] অন্যান্য দলগুলিকে হামলার দিনে যোগ দিতে বলেছিল।

কিংস কলেজ লন্ডনের সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আন্দ্রেস ক্রিগ বলেন, পরিকল্পনাটি কেন্দ্রীয়ভাবে করা হলেও বাস্তবায়নের সময় তা সবার মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়।প্রতিটি স্কোয়াড যেভাবে সম্ভব তেমন ভাবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত করে। হামাসের অভ্যন্তরের লোকজন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা দেখে বিস্মিত হয়েছে বলে জানা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে যে জঙ্গিরা সম্ভবত অফলাইনে যোগাযোগের মাধ্যমে ইসরায়েলের নজরদারি প্রযুক্তিকে ফাঁকি দিতে সক্ষম হয়েছে।

ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক হিউ লোভাট বলেন, ইসরায়েল এই যৌথ প্রশিক্ষণ মহড়া সম্পর্কে অবগত ছিল, কিন্তু ‘ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে’, কারণ তারা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে আধাসামরিক গোষ্ঠীগুলোর সাধারণ কার্যকলাপের ‘নিরিখে’ বিচার করেছিল; ‘বৃহৎ আকারের আক্রমণের সম্ভাবনা রয়েছে’ একথা ভেবে নয়।

এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর তরফে বলা হয়েছে যে, তারা বর্তমানে সন্ত্রাসী সংগঠন হামাসের হুমকি নির্মূল করার দিকে মনোনিবেশ করছে এবং কোনও সম্ভাব্য ব্যর্থতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে জানানো হয়েছে “পরবর্তী পর্যায়ে খতিয়ে দেখা হবে। ইসরায়েল ৭ই অক্টোবরের গণহত্যা প্রতিরোধের সুযোগ হাতছাড়া করেছে কিনা তা আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করতে বেশ কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। কিন্তু এর প্রভাব সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং সররের ভিত নড়িয়ে দিতে পারে।