আন্তর্জাতিক

সুড়ঙ্গ থেকে ১৭ দিন পর জীবিত উদ্ধার ৪১ শ্রমিক

বাংলার কথা বাংলার কথা

প্রকাশিত: ১২:০৯ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২৯, ২০২৩

ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের একটি নির্মীয়মাণ সুড়ঙ্গ ধসে পড়ে আটকে পড়া ৪১ জন শ্রমিককে মঙ্গলবার রাতে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তারা গত ১৭ দিন ধরে সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকিয়ে ছিলেন। সুড়ঙ্গের ভেতরে জমে থাকা ধসের শেষ অংশটি হাতে কাটা হয়। তার আগে শ্রমিকদের উদ্ধারের প্রচেষ্টা বারে বারে বাধা পেয়েছে। শেষমেশ মঙ্গলবার ভারতীয় সময় রাত আটটা নাগাদ প্রথম শ্রমিককে বার করে নিয়ে আসা হয়, আর বাকি সবাইকে বার করতে ঘন্টাখানেকেরও কম সময় লাগে। প্রত্যেক শ্রমিককে ফুলের মালা দিয়ে স্বাগত জানানো হয়। এর আগে ধারণা করা হচ্ছিল যে মঙ্গলবার বিকেলের মধ্যেই সবাইকে উদ্ধার করা যাবে।

উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামী ভারতীয় সময় বেলা দুটোর সময়ে তার এক্স (আগেকার টুইটার) হ্যান্ডেলে লেখেন যে ধসে পড়া মাটি-পাথরের ভেতর দিয়ে পাইপ গুঁজে দেওয়ার কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু তার ঘণ্টা দুয়েক পরে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষ এক সংবাদ সম্মেলনে জানান যে তখনও শেষ দুই মিটার গর্ত খোঁড়া বাকি আছে। সেই কাজ শেষ করে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ উদ্ধারকারীদের দলটি সুড়ঙ্গের ভেতরে প্রবেশ করেন আর আধঘণ্টার মধ্যে প্রথম শ্রমিককে বার করে নিয়ে আসা হয়। সবাইকে উদ্ধার করতে ঘন্টাখানেকেরও কম সময় লাগে।

প্রত্যেক শ্রমিককে পৃথক অ্যাম্বুলেন্সে চাপিয়ে হাসপাতালের দিকে রওয়ানা করিয়ে দেওয়ার পরে সুড়ঙ্গ মুখেই আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করেন মুখ্যমন্ত্রী  ধামী ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভি কে সিং। তারা জানিয়েছেন ৪৮ থেকে ৭২ ঘন্টা হাসপাতালে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে থাকবেন শ্রমিকরা।

পাইপের ভেতর দিয়ে উদ্ধার
শ্রমিকদের উদ্ধারের জন্য জাতীয় ও রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, সেনাবাহিনী, সেনাবাহিনীর অধীন বর্ডার রোডস অর্গানাইজেশন যেমন নেমেছিল, তেমনই আন্তর্জাতিক মাইক্রো টানেলিং বিশেষজ্ঞ ক্রিস কুপারকেও নিয়ে আসা হয়েছিল। সুড়ঙ্গের ভেতরে ৯০০ মিলিমিটার একটি লোহার পাইপ গুঁজে দিয়ে তা দিয়েই বার করে আনা হয় আটকিয়ে পড়া শ্রমিকদের। এতদিন ধরে দুটি অন্য পাইপ দিয়ে শ্রমিকদের জন্য খাবার, পানীয় এবং অক্সিজেন পাঠানো হচ্ছিল। নির্মীয়মাণ সুড়ঙ্গটি ‘চারধাম প্রকল্প’-এর অংশ, যা বদ্রীনাথ, কেদারনাথ, যমুনোত্রী এবং গঙ্গোত্রীর হিন্দু তীর্থস্থানগুলিকে একই রাস্তা দিয়ে জুড়বে। এটি একটি বিতর্কিত প্রকল্প এবং পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে এই প্রকল্পটি আকস্মিক বন্যা এবং ভূমিধসের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে, যা ইতিমধ্যে ওখানে একটি বড় সমস্যা।

সরাসরি হাসপাতালে
সুড়ঙ্গের ভেতরে পাইপ গুঁজে দেওয়ার কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সিল্কিয়ারার দিকে চূড়ান্ত তৎপরতা দেখা যায়। উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেনারেল ভি কে সিং-সহ শীর্ষ কর্মকর্তারা সুড়ঙ্গ মুখে অপেক্ষা করছিলেন। সার দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স আর চিকিৎসকদের দলও অপেক্ষা করে ছিল।সুড়ঙ্গ মুখে গড়া হয়েছিল একটা অস্থায়ী চিকিৎসা কেন্দ্রও। উদ্ধার হওয়া সব শ্রমিকের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। উদ্ধার করার পরে প্রত্যেককে পৃথক অ্যাম্বুলেন্সে করে ৩০ কিলোমিটার দূরের একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পরে দুটি হেলিকপ্টারে করে ঋষিকেশের এইমস হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে আগামী কাল (বুধবার), এমনটাই জানিয়েছেন বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষের সদস্য অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল সৈয়দ আতা হাসনাইন। শ্রমিকদের প্রত্যেকের জন্য গাঁদা ফুলের মালা নিয়ে আসতে দেখা যায় দুজন সরকারী কর্মকর্তাকে।গত ১৭ দিন ধরে সুড়ঙ্গমুখে অপেক্ষা করছিলেন শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যরা। তাদের কয়েকজনকে আনন্দে কেঁদে ফেলতে দেখা যায়।

শেষ অংশটি হাতে কাটা হয়
বারে বারে উদ্ধার প্রচেষ্টা বাধা প্রাপ্ত হওয়ার পরে দুদিন আগে যন্ত্র দিয়ে গর্ত খোঁড়ার চেষ্টা বন্ধ করে এমন কয়েকজন শ্রমিককে নিয়ে আসা হয়, যারা হাতে মাটি কেটে কয়লার খনিতে গর্ত খোঁড়ায় পারদর্শী। যন্ত্র দিয়ে ৪৭ মিটার পর্যন্ত কাটা হয়েছিল, বাকি দশ মিটার হাতে কাটা হয়। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মেঘালয়ে এধরণের কয়লা খনিগুলিকে ‘র‍্যাট হোল’ বা ইঁদুরের গর্ত বলা হয় আর এইসব খনিগুলির সবই বেআইনি। সেরকমই ১১জন খনি শ্রমিককে উড়িয়ে নিয়ে আসা হয়, যারা সুড়ঙ্গের ভেতরে গর্ত খোঁড়ার কাজ শেষ করেন। সোমবার রাত পর্যন্ত ওই খনি শ্রমিকরা ধসের ভেতর দিয়ে তিন মিটার পর্যন্ত গর্ত খোঁড়ার কাজ শেষ করে ফেলেছিলেন। মঙ্গলবার সকালে আন্তর্জাতিক সুড়ঙ্গ বিশেষজ্ঞ ক্রিস কুপার সংবাদ সংস্থা এএনআইকে জানান, “৫০ মিটার পর্যন্ত মাটি কাটার কাজ শেষ হয়ে গেছে। মাত্র ৫-৬ মিটার গর্ত খোঁড়া বাকি আছে।“

উদ্ধার প্রচেষ্টায় বারেবারে বাধা
আটকিয়ে থাকা শ্রমিকদের বার করে আনার জন্য বিভিন্ন প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে গত ১৭ দিন ধরে। প্রথমে চেষ্টা করা হচ্ছিল ভূমি ধসের ফলে সুড়ঙ্গের ভেতরে যে মাটি-পাথর জমা হয়েছে, সেগুলো সরিয়ে শ্রমিকদের কাছে পৌঁছনোর। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পরে ফের ধস নামে, তাই সেই পদ্ধতি বাতিল করা হয়। পরে মাটি কাটার যন্ত্র দিয়ে ধ্বংসাবশেষের ভেতরে গর্ত খোঁড়ার চেষ্টা হয়। সেই যন্ত্রও খারাপ হয়ে যায়। তারপরে দিল্লি থেকে আরেকটি বড় মাটি কাটার যন্ত্র এনে ধ্বংসাবশেষের ভেতর দিয়ে ৯০০ মিলিমিটার ব্যাসের একটা পাইপ গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছিল। শুক্রবার রাতে সেই যন্ত্রও থমকিয়ে যায়। তারপরে আরও একটি বড় মাটি কাটার যন্ত্র নিয়ে এসে সুড়ঙ্গের ভেতরে ৯০০ মিলিমিটার ব্যাসের পাইপটি গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সুড়ঙ্গের ভেতরে কখনও সেই যন্ত্রটির ব্লেড ভেঙ্গে গিয়ে, আবার কখনও ধসে পড়া মাটি-পাথরের মধ্যে থাকা লোহায় ব্লেড আটকিয়ে গিয়ে উদ্ধার প্রচেষ্টা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সোজাসুজি গর্ত খোঁড়ার প্রচেষ্টার সঙ্গেই পাহাড়ের ওপর থেকেও গর্ত খোঁড়া হচ্ছিল।