৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

পেটে হাত ঢুকিয়ে পাচার করা টাকা বের করে আনব: জামায়াত আমির

অন্য দলের নেতাদের প্রতি সংলাপের আহ্বান জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আগামী দিনে কে কী করব, আসুন সংলাপ করি। খোলা ময়দানে আমাদের প্রশ্ন করুন। আমরা জবাব দিই, আপনারাও দিন।’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে দেশজুড়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। গতকাল বুধবার কিশোরগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও টাঙ্গাইলে জনসভায় দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান বৈষম্যহীন ও মানবিক রাষ্ট্র গড়ার অঙ্গীকার করেছেন। তিনি গতানুগতিক ক্ষমতার রাজনীতির বদলে ১৮ কোটি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন।

জামায়াত আমির প্রতিপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘ছলে-বলে-কৌশলে আমাকে জিততে হবে– এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসেন। পুরোনো স্লোগান থেকে বেরিয়ে আসেন। আমার ভোট আমি দেব, তোমারটাও দেব– এই দিন শেষ।’

বেলা ১১টায় কটিয়াদী উপজেলা সদরের সরকারি কলেজ মাঠে সভায় ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমার এক্স (টুইটার) হ্যাক হয়েছে। আইটি টিম, সাইবার টিম সেটি উদ্ধার করেছে। কোথা থেকে হ্যাক হয়েছে, সেটিও জানা গেছে। অথচ একটি রাজনৈতিক সংগঠন সবকিছু জেনেও এটা নিয়ে ফায়দা লুটছে।

তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী দলীয় সরকার করতে চায় না। আমি জামায়াতের বিজয় চাই না, ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই। কোনো দুর্বৃত্ত এখন আর কারও ভোটে হাত দিতে পারবে না।
আমির বলেন, ১২ তারিখ দুটি ভোট হবে। প্রথম গণভোট। ‘হ্যাঁ’ যদি জেতে বাংলাদেশ জিতে যাবে। ‘হ্যাঁ’ যদি হারে, বাংলাদেশ হারবে।

রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা সব বন্ধু রাষ্ট্রের সঙ্গে মুক্ত সম্পর্ক রেখে চলব। কারও প্রভুত্ব মানব না। দুর্নীতিবাজকে ক্ষমতায় যেতে দেব না, নিজেরাও দুর্নীতি করব না। চাঁদাবাজি বাংলাদেশে আর চলতে দেব না। আমাদের তো চাঁদাবাজির প্রশ্নই আসে না। কোনো মামলাবাজিও হবে না।

নারী আমাদের শক্তির অংশ
কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ মাঠে শফিকুর রহমান বলেন, ‘মা জাতিকে বাদ দিয়ে দেশ কখনোই এগিয়ে যেতে পারে না। নারীরা আমাদের শক্তির অংশ। আমার এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে তারা আমাদের নামে কুৎসা রটিয়ে বেড়াচ্ছে। আর একটি দল তাইরে নাইরে বলে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। লজ্জা, ওদের চুনোপুঁটিসহ বড় নেতারাও গান গাওয়া শুরু করল। আমাদের সাইবার টিম তাদের শক্তভাবে ধরে ফেলেছে। অভিযুক্তকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। সত্য ঢাকা থাকে না।’

তিনি বলেন, দেশের সব জাতিগোষ্ঠী, ধর্ম ও মতের মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে বঞ্চিত রংপুর অঞ্চলকে কৃষিশিল্পের রাজধানীতে পরিণত করবে। আমাদের নদীগুলোকে কঙ্কাল বানিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

আগের সরকারগুলোকে ‘চোর’ অভিহিত করে তিনি বলেছেন, নদীভাঙন রোধের জন্য যতগুলো বাজেট হয়েছে, সব তাদের পেটে গেছে। এই চোরেরা টাকা চুরি করে বিদেশে পাচার করেছে ২৮ লাখ কোটি টাকা। আমরা যদি সুযোগ পাই, তাহলে ওদের পেটে হাত ঢুকিয়ে সব বের করে আনব। রংপুরের পিছিয়ে পড়া কুড়িগ্রাম থেকে জামায়াতের উন্নয়ন শুরু হবে বলে ঘোষণা করেন তিনি।

চাঁদাবাজি, মামলাবাজি নয়
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলায় তিস্তা হেলিপ্যাড মাঠে দুপুরে শফিকুর রহমান বলেন, ‘রাজনীতির নামে ব্যবসা নয়, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও মামলাবাজি নয়। রাজনীতির নামে আমার মায়ের গায়ে হাত দেওয়া নয়।’

তিনি বলেন, দুর্নীতি ও রাজনীতি একসঙ্গে চলতে পারে না। রাজনীতি হলো নীতির রাজা। দুর্নীতি যারা করে তারা তো ডাকাত, চোর ও লুণ্ঠনকারী।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, তিস্তা এ অঞ্চলের মানুষের কাছে এক সাগর দুঃখ। তিস্তাকে নতুন করে জীবন দেওয়া হবে। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে তিস্তা হবে উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু। যে কোনো মূল্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। কারও রক্তচক্ষুকে পরোয়া করা হবে না। আমরা কারও স্বার্থে আঘাত করব না। আমাদের স্বার্থে কেউ বাগড়া দিলে মেনে নেব না।

নেতাকর্মীরা প্রতিশোধ নেয়নি
টাঙ্গাইল শহীদ স্মৃতি পৌর উদ্যানে বিকেলে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিগত দিনে অনেক সরকার এসেছে। তারা জনগণকে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কোনো প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। দেশে বৈষম্য সৃষ্টি করেছিল। এ কারণে যুবসমাজ ফুঁসে উঠেছিল। তাদের একটাই দাবি– আমরা ন্যায্য বিচার চাই। আমরা বাঁচার অধিকার চাই। শিশুর জন্য শিক্ষা চাই। যুবকের জন্য কাজ চাই। মা-বোনদের জন্য নিরাপত্তা চাই। ব্যবসায়ীদের জন্য নিরাপত্তা ও শান্তিতে ব্যবসা করার পরিবেশ চাই। ভালো কর্মপরিবেশ চাই।

তিনি কোনো দলের নাম উল্লেখ না করে আরও বলেন, একটি দল আমাদের মতো মজলুম ছিল, তারা মানুষকে কষ্ট দিচ্ছে, চাঁদাবাজি করছে, দুর্নীতি করছে, দখলবাজি, মামলাবাজি করছে। তারা দখলবাজি ও মামলাবাজিতে ব্যস্ত। শুধু তাই না, নির্বাচন সামনে রেখে এজেন্টদের ধরে নিয়ে হুমকি দিচ্ছে। ভুলে যান, সেদিনের কবর রচনা হয়ে গেছে।
শফিকুর রহমান বলেন, নেতাকর্মীদের মামলা দিয়ে জেলখানায় নিয়ে রিমান্ডের নামে নির্যাতন করে টাকা আদায় করেছে। আমরা কারও নামে মামলা দিয়ে টাকা নিইনি। মামলা বাণিজ্য করিনি। অভ্যুত্থানের পর দেশে যখন পুলিশ কাজ করছিল না, তখন আমাদের নেতাকর্মীরা সব জায়গা পাহারা দিয়েছে। কোনো ক্ষতি করতে দেয়নি। মসজিদ, মন্দির, ঝুঁকিপূর্ণ বাড়িগুলো পাহারা দিয়েছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো পাহারা দিয়ে দায়িত্ব পালন করেছে।

তিনি বলেছেন, আমরা বসন্তের কোকিল না যে এলাম, প্রতিশ্রুতি দিলাম, চলে গেলাম। আমাদের ওপর অনেক নির্যাতন হয়েছে। কিন্তু আমরা কোথাও যাইনি। দেশের মাটিতেই ছিলাম। কথা দিচ্ছি, দেশ ছেড়ে কোথাও যাব না। আপনাদের সুখেও থাকব, দুঃখেও থাকব। আমরা একটি মানবিক দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছি। এ স্বপ্ন জুলাইযোদ্ধাদের। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা একটি মানবিক দেশ গড়ব। আগামী ১২ তারিখেও আমরা জয়ী হবো। আমরা জয়ী হতে পারলে যুবকদের কাজ দিয়ে, প্রশিক্ষণ দিয়ে দুই হাত ভরিয়ে দেব।

তিনি ঘোষণা করেন, সবার জন্য আইন হবে সমান। তৃণমূল পর্যায় থেকে সরকারের সর্বোচ্চ ব্যক্তির জন্য একই আইনে বিচার হবে। কোনো দায়মুক্তি নেই। তাহলে সবাই সামাজিক সুরক্ষা পাবে।

Home R3